আপনার দৃষ্টি এবং চিন্তার বাইরেও জীব আছে
এক সময় মানুষ নিশ্চিত ছিল—জীবন মানে আলো। সূর্যের আলো ছাড়া কিছুই বাঁচতে পারে না। অন্ধকার, প্রচণ্ড তাপ আর ভয়ংকর চাপ—এসব মানেই মৃত্যু। এই ধারণা এতটাই শক্ত ছিল যে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত বিজ্ঞানীরাও একে প্রশ্ন করার সাহস পাননি। পৃথিবীর গভীর অংশকে তখন ধরা হতো সম্পূর্ণ মৃত, নীরব, নিষ্প্রাণ।
কিন্তু ১৯৮৭ সালের পর থেকে সেই নিশ্চয়তা ভাঙতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রে মাটির প্রায় ৫০০ মিটার নিচে ড্রিলিং করার সময় বিজ্ঞানীরা এমন অণুজীব খুঁজে পান, যেগুলো তখনো জীবিত। কোনো আলো নেই, কোনো বাতাস নেই—তবু জীবন আছে। প্রথমে অনেকে বিশ্বাসই করতে চাননি। মনে করা হয়েছিল, হয়তো দূষণ। হয়তো উপরের দুনিয়া থেকে ভুল করে নেমে গেছে।
কিন্তু প্রমাণ জমতে থাকে।
১৯৯২ সালে বিজ্ঞানী থমাস গোল্ড একটি ভয়ংকর ধারণা সামনে আনেন—পৃথিবীর গভীরে, উত্তপ্ত শিলার ভেতরেও জীবন থাকতে পারে। তিনি একে বলেন “Deep Hot Biosphere”। তখন অনেকেই একে কল্পবিজ্ঞান বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই বাস্তবতা কথা বলতে শুরু করে।
১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮—সমুদ্রতলের সেডিমেন্টে, গভীর খনিতে, একের পর এক অণুজীব আবিষ্কৃত হয়। তারা সূর্যের আলো চেনে না। অক্সিজেন তাদের প্রয়োজন নেই। তারা বাঁচে পাথরের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে।
এরপর আসে ২০০৮ সাল।
দক্ষিণ আফ্রিকার একটি স্বর্ণখনিতে, প্রায় ৩ কিলোমিটার গভীরে, বিজ্ঞানীরা এমন এক ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পান—যেটি সম্পূর্ণ একা। বাইরের কোনো জীবের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সে একই জায়গায় আটকে আছে। নাম দেওয়া হয় Desulforudis audaxviator—অর্থাৎ “নির্ভীক একাকী যাত্রী”। এই জীব সূর্য ছাড়াই, অক্সিজেন ছাড়াই, ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধ শিলার ভেতর থেকে শক্তি বের করে বেঁচে আছে।
এ যেন পৃথিবীর বুকে লুকিয়ে থাকা এক নীরব বন্দী জীবন।
২০১৬ সালে জাপানের নানকাই ট্রফে ১১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও জীবিত কোষের প্রমাণ পাওয়া যায়। এমন তাপ যেখানে মানুষ তো দূরের কথা, বেশিরভাগ জীবাণুও টিকতে পারে না। অথচ তারা সেখানে ধীরগতিতে বেঁচে আছে—কখনো কখনো হাজার বছর পর একবার মাত্র বিভাজিত হয়। যেন সময় তাদের ছুঁতেই পারে না।
২০১৮ সালে রহস্য আরও গভীর হয়।
Deep Carbon Observatory নামের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্প, দশ বছরের অনুসন্ধানের পর জানায়—পৃথিবীর গভীরে ১৫ থেকে ২৩ বিলিয়ন টন কার্বন-ভিত্তিক জীবন আছে। ওজনের হিসেবে যা সমস্ত মানুষের সম্মিলিত ওজনের প্রায় ৩০০ গুণ। সমুদ্রের দ্বিগুণ জায়গা জুড়ে এই অদৃশ্য জীবজগৎ বিস্তৃত। আমরা যে জীবন দেখি, তা আসলে উপরের পাতলা স্তর মাত্র।
২০২৪–২০২৫ সালে গ্রিনল্যান্ডে এমন অণুজীবের চিহ্ন পাওয়া যায়, যেগুলোর বয়স প্রায় ৭৫ মিলিয়ন বছর। অত্যন্ত ক্ষারীয়, শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশেও তারা টিকে ছিল। পৃথিবী যেন তার গভীর স্মৃতি খুলে দেখাতে শুরু করেছে।
আজ নিশ্চিতভাবে বলা যায়—ভূত্বকের ২ থেকে ৫ কিলোমিটার, কোথাও কোথাও ১০ কিলোমিটার গভীরেও জীবন আছে। পৃথিবীর মোট বায়োমাসের বড় একটি অংশ সেখানে বাস করে। সমস্ত ব্যাকটেরিয়া ও আর্কিয়ার প্রায় ৭০ শতাংশ আমাদের পায়ের নিচে, অন্ধকারে, নীরবে কাজ করে যাচ্ছে।
এই আবিষ্কার আমাদের তিনটি বিশ্বাস চূর্ণ করেছে। জীবন মানেই আলো—ভুল। জীবন মানেই অক্সিজেন—ভুল। জীবন শুধু পৃথিবীর পৃষ্ঠে—ভুল।
বরং মনে হচ্ছে, জীবনের শুরু হয়েছিল এই গভীর অন্ধকারেই। সূর্য ওঠার অনেক আগেই।
ধর্মীয় দৃষ্টিতে তাকালে এই অদ্ভুত নীরবতা আরও গভীর হয়ে ওঠে। কুরআনের সেই আয়াত
'و یخلق ما لا تعلمون '
“আর তিনি) আল্লাহ ) এমন সব সৃষ্টি করেছেন, যা তোমরা জানো না”—
আজ আর শুধু আধ্যাত্মিক বাক্য নয়, বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিতের মতো শোনায়। যেন হাজার বছর আগেই বলা হয়েছিল—সবকিছু চোখে দেখা যায় না।
এই কারণেই এখন বিজ্ঞানীরা মঙ্গলগ্রহের নিচে, ইউরোপা আর এনসেলাডাসের বরফের তলায় জীবনের সন্ধান করছেন। কারণ পৃথিবী দেখিয়ে দিয়েছে—জীবন আলো চায় না, শুধু সুযোগ চায়।
আমরা পৃথিবীর উপরিভাগে হাঁটি, কথা বলি, যুদ্ধ করি।
কিন্তু আমাদের পায়ের নিচে—
অন্ধকারে, পাথরের ভেতর—
জীবন এখনো নিঃশব্দে বেঁচে আছে।

Comments
Post a Comment