আমি কেন আল্লাহকে মানি ?



 'আমি কেন আল্লাহকে মানবোনা অথচ তিনি হচ্ছেন বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা '


 আমি কেন আল্লাহকে বিশ্বাস করি?


এই প্রশ্নটা আমি নিজেকেই করি: আমি আল্লাহকে কেন বিশ্বাস করি? আর ইসলামের আল্লাহকেই বা কেন বিশ্বাস করি? আসলে এটা দুটি প্রশ্ন, আর এর উত্তর যা আমি নিজের জন্য পেয়েছি, তা আপনাদের সামনে রাখছি।


আল্লাহ আছেন কেন?


কারণ বুদ্ধি-বিবেকের কাছে এর বাইরে আর কোনো যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা নেই। এই মহাবিশ্ব আমাদের সামনে বিদ্যমান, আর তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গড়া। এই দুনিয়ায় এমন কোনো জিনিস নেই যা তৈরি হয়েছে, কিন্তু আমরা ভাবি যে তা নিজে থেকেই হয়ে গেছে এবং কোনো স্রষ্টা নেই। তাই এত বিশাল মহাবিশ্বের ব্যাপারে এটা বলা একেবারে অযৌক্তিক যে সেটা নিজে থেকে তৈরি হয়ে গেছে।


সর্বোচ্চ যেটা বলা যায়, সেটা হলো বিগ ব্যাং থিওরি—একটা বিস্ফোরণ হলো আর মহাবিশ্বের অস্তিত্ব শুরু হলো। কিন্তু সেই বিস্ফোরণটা ঘটল কোথায়? কে করল? কীভাবে করল? এটাও আবার অযৌক্তিক যে কিছুই ছিল না, হঠাৎ শূন্যতায় কোনো কারণ ছাড়া, কোনো উপাদান ছাড়া, কারো উপস্থিতি ছাড়া বিস্ফোরণ হয়ে গেল আর সবকিছু তৈরি হয়ে গেল—এত নিখুঁতভাবে যে আজও আমরা এতে নতুন নতুন জিনিস আবিষ্কার করে চলেছি। তাই অবশ্যই কেউ আছেন, আর সেই কাউকে আমরা আল্লাহ বলি।


 আল্লাহ আছেন ঠিক আছে, কিন্তু ইসলামের আল্লাহই কেন? অন্য কোনোটা কেন নয়?


এখন এই আল্লাহকে খুঁজতে হবে। আর এই খোঁজে আমার সামনে বিভিন্ন ধর্ম আসে, যারা আল্লাহ সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা দেয়। তাই প্রশ্নটা আসলে এরকম: বিভিন্ন ধর্ম আল্লাহর বিভিন্ন গুণাবলী বর্ণনা করেছে, তাহলে আমি শুধু ইসলামের বর্ণিত গুণাবলীই কেন গ্রহণ করি?


এর জন্য আমি প্রথমে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হয়ে সব ধর্মকে সমান চোখে দেখি। এখন আমার সামনে দুই ধরনের ধর্ম আসে:


১. যেসব ধর্ম কোনো আসমানি গ্রন্থের দাবি করে না। তাহলে তারা আল্লাহর গুণাবলী কীভাবে জানল? তাদের কাছে শুধু পূর্বপুরুষদের গল্প-কাহিনী আছে। আর গল্পের উপর আমি ভরসা করতে পারি না।


২. যেসব ধর্ম আসমানি গ্রন্থের দাবি করে। এদেরকেই আমি বিবেচনা করি।


এখন আসমানি গ্রন্থের দাবি করা ধর্মগুলোর গ্রন্থগুলোর মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি:


তাওরাত: সবচেয়ে প্রাচীন গ্রন্থ। কিন্তু মাঝখানে প্রায় দুইশো বছর জনসাধারণের কাছ থেকে লুপ্ত ছিল, শুধু পুরোহিত ও লেভীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এ সময়ে কী কম-বেশি হয়েছে, তার কোনো প্রমাণ নেই কারণ পূর্ববর্তী লিখিত সংস্করণগুলো আর নেই। স্বয়ং তাওরাতে হযরত মূসা (আ.)-এর মৃত্যু এবং তার পরবর্তী কিছু ঘটনার বিবরণ আছে। এ থেকে বোঝা যায় যে পরবর্তীকালে এতে অনেক কিছু যোগ করা হয়েছে। আসলে এটা একক গ্রন্থ নয়, বরং বিভিন্ন যুগের নবী ও মানুষের শিক্ষার সংকলন। এ অবস্থায় এর আসমানি হওয়ার দাবি অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে।


ইঞ্জিল: এর তো চারটি প্রধান এবং আরও অনেক ছোট সংস্করণ আছে, যেগুলোর মধ্যে পার্থক্য আছে। এটা স্বীকৃত যে এগুলো হযরত ঈসা (আ.)-এর শিষ্যদের পরবর্তীকালে লিখিত ও সংগৃহীত। এটা মূলত তাঁর শিক্ষা সংরক্ষণের প্রচেষ্টা ছিল, যাতে অবশ্যই সেই শব্দগুলো থাকার কথা নয় যা হযরত ঈসা (আ.)-এর উপর গ্রন্থ হিসেবে নাযিল হয়েছিল। ফলে এর আসমানি হওয়ার দাবিও দুর্বল।


অন্যান্য গ্রন্থসমূহ যেসব ছোটখাটো পুস্তকের আসমানি দাবি আছে, সেগুলো ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল এবং তাদের সনদ পাওয়া যায় না।


কুরআন: এই গ্রন্থকে শুরু থেকেই নামাযে পড়া হয়েছে, বিভিন্ন উপকরণে লেখা হয়েছে এবং মুখস্থ করা হয়েছে। পরে একত্রে লিখিত রূপ দেওয়া হয়। মুখস্থের ধারা আলাদাভাবে চলতে থাকে। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বের কোথাও এর একটি শব্দেরও পার্থক্য পাওয়া যায় না। একাধিক কিরাআত আছে, কিন্তু সেগুলোও মূলের সাথে পুরোপুরি সংযুক্ত। প্রতিটি অক্ষরের কম-বেশির বিস্তারিত ইতিহাসও সংরক্ষিত। এটা অন্য তিনটির চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে আছে।


কিন্তু এর মানে এই নয় যে এটা অবশ্যই আল্লাহ নাযিল করেছেন। এটা শুধু প্রমাণ করে যে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এটা অপরিবর্তিত আছে। এটা কীভাবে প্রমাণিত হবে যে এটা সত্যিই আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে? এর জন্য এতে এমন কিছু চিহ্ন থাকতে হবে যা কোনো মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। তাই আমি কুরআন খুলি এবং দেখি:


১. মাত্র দুই-আড়াইশো বছর আগ পর্যন্ত কেউ জানত না যে বৃষ্টির জন্য বাতাসে আর্দ্রতা (হিউমিডিটি) অপরিহার্য; না থাকলে বৃষ্টি হয় না, বরং ‘ভির্গা’ হয়—অর্থাৎ মেঘ থেকে পানি বের হতেই বাষ্প হয়ে উবে যায়।  

و ارسلنا الریح لواقح فانزلنا من السمآء مآء فاسقینكموه و ما انتم لهٗ بخزنین

আর আমি বায়ুকে ঊর্বরকারীরূপে প্রেরণ করি অতঃপর আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা তোমাদের পান করাই। অথচ তোমরা তার সংরক্ষণকারী নও।

(সূরা আল-হিজর: ২২)  

কোনো মানুষের পক্ষে এটা তখন জানা কীভাবে সম্ভব?


২. উচ্চতায় গেলে পাঁচ হাজার মিটারের পর অক্সিজেনের চাপ এত কমে যায় যে বুক চাপতে থাকে, কষ্ট করে শ্বাস নিতে হয়। কুরআনের অবতীর্ণের সময় মক্কা-মদীনা বা আরব উপদ্বীপে এত উঁচু পাহাড় ছিল না। হিমালয়ের মতো এলাকার লোকেরা সেখানে আসতও না। এত উঁচুতে স্থায়ী বসতিও খুব কম। আরবে এটা কারো জানার কথা নয়।  

কিন্তু কুরআন স্পষ্ট উপমা দেয়: 

 و من یرد ان یضلهٗ یجعل صدرهٗ ضیقا حرجا كانما یصعد فی السمآء كذلك یجعل الله الرجس علی الذین لا یؤمنون 

সুতরাং যাকে আল্লাহ যাকে ভ্রষ্ট করতে চান, তার বুক সঙ্কীর্ণ-সঙ্কুচিত করে দেন, যেন সে আসমানে আরোহণ করছে। এমনিভাবে আল্লাহ অকল্যাণ দেন তাদের উপর, যারা ঈমান আনে না। 


সূরা আনআম ১২২


যেরূপ জোর করে আকাশে আরোহণ সম্ভব নয়, (যেহেতু উপরে অক্সিজেন নেই।)


 (সূরা আল-আন‘আম: ১২৫)  

কীভাবে সম্ভব?


৩. মাত্র দেড়শো বছর আগ পর্যন্ত কেউ জানত না যে মানুষের আঙ্গুলের ছাপ এত অনন্য যে দুজন মানুষের মিলবে না। কিন্তু কুরআন স্পষ্ট বলে:  

اَيَحۡسَبُ الۡاِنۡسَانُ اَلَّنۡ نَّجۡمَعَ عِظَامَهٗؕ‏

بَلٰى قٰدِرِيۡنَ عَلٰٓى اَنۡ نُّسَوِّىَ بَنَانَهٗ‏

“মানুষ কি মনে করে যে আমরা তার হাড়গুলো একত্র করতে পারব না? বরং আমরা তার আঙ্গুলের ডগাগুলোকেও পুরোপুরি ঠিক করে গড়তে সক্ষম।” (সূরা আল-কিয়ামাহ: ৩-৪)  


ভাষাটাই বলে দেয় যে এটা একটা অসম্ভব মনে হওয়া কাজের কথা বলা হচ্ছে, যা আল্লাহ সহজেই করতে পারেন। লেখক যদি মানুষ হতেন, তিনি এটা কীভাবে জানলেন? সবচাইতে মারাত্মক হচ্ছে এই যে " চামড়া এই গঠন ডিএনএ থেকে ভ্রণ অবস্থায় হয়ে যায়, লক্ষ কোটির মাঝে সুক্ষ ভাবে আলাদা। আর যদি কখনো কোনো কারণে চামড়া পুড়ে যায়, আবার নতুন করে অনুরুপ গজাবে , একটুও পরিবর্তন হবেনা।

سبحان الله


এগুলো মাত্র তিনটি উদাহরণ। এরকম আরও অনেক আছে—যেমন ভ্রন বিদ্যা সূর্যের গতি ইত্যাদি। এসব তথ্য মানুষ পরবর্তীকালে আবিষ্কার করেছে, কিন্তু কুরআন শতাব্দী আগেই বলেছে। এর সোজা অর্থ: কুরআন সত্যিই সেই সত্তার গ্রন্থ, যিনি এসব কিছু সৃষ্টি করেছেন; নইলে এসবের জ্ঞান তার থাকার কথা নয়। যদি অনুমানেও হতো, তাহলে এক-দুটি মিলত; এমন পূর্ণ নিখুঁততা কীভাবে সম্ভব?


তাছাড়া স্কিনে যে ব্যাথা হয় সাইন্স সবে মাত্র বলেছে। কিন্তু কুরআন তার অনেক আগেই ঘোষণা করেছে যে ব্যাথা চামড়া অনুভব করে। 


আর বিগ ব্যাং এবং মহিবিশ্ব সম্প্রসারণ এই তো আমরা এই জানলাম কিন্তু কুরআন আমাদের ১৪০০ বছর আগে رتقا، فتقا এবং موسعون শব্দ দ্বারা জানিয়ে দিয়েছে।


যখন এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, তখন আমি কুরআন থেকেই আল্লাহর গুণাবলী জানি এবং সেখান থেকেই পথনির্দেশ নিই। কুরআন আমাকে বলে:


আল্লাহর নাম ‘আল্লাহ’, তিনি মহান গুণসম্পন্ন মালিক। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তিনি রাসূল ও নবী প্রেরণ করেছেন। তাওরাত ও ইঞ্জিলও তিনি দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে তাতে পরিবর্তন হয়ে গেছে। তিনিই প্রতিদান ও শাস্তির একটি দিন নির্ধারণ করেছেন এবং মানুষকে দুনিয়ায় স্বাধীন ইচ্ছা দিয়েছেন—ভালো করবে না মন্দ করবে। বরং তিনি আমাকে এটাও বলেন যে মানুষকে প্রতিটি কাজের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে যাতে সে সঠিক জায়গায় তা ব্যবহার করে।


পরিশেষে আপনাদের এক রাখালের উদাহরণ দি। সে কিভাবে মহাবিশ্বের স্রষ্টা ডিজাইনার কে চেনাল জন্য কিছু মূল্যবান কথা নিজের অন্তরের গভীর তলদেশ থেকে বের করে বলে 


إنّ البَعَرَةُ تَدُلُّ عَلَى الْبَعِيرِ 

وَالرَّوْثُ عَلَى الْحَمِيرِ

وَآثَارُ الْأَقْدَامِ عَلَى الْمَسِيرِ

فَسَمَاءٌ ذَاتُ أَبْرَاجٍ

وَأَرْضٌ ذَاتُ فِجَاجٍ

وَبِحَارٌ ذَاتُ أَمْوَاجٍ

أَمَا تَدُلُّ عَلَى الصَّانِعِ الْحَلِيمِ الْعَلِيمِ الْقَدِيرِ؟


মাটিতে যদি উটের বিষ্ঠা দেখি, বুঝি—এখানে উট গেছে।

গাধার বিষ্ঠা দেখলে বুঝি গাধা গেছে।

পায়ের ছাপ দেখলে বুঝিকেউ হেঁটে গেছে।

তাহলে বলো—তারাগুলোতে ভরা‌ আকাশ,‌পথ-প্রান্তর জুড়ে বিস্তৃত পৃথিবী,‌ ঢেউয়ে ভরা সমুদ্র এসব কি একজন নির্মাতা, একজন সুপরিকল্পনাকারী, একজন সর্বশক্তিমান স্রষ্টার দিকে ইশারা করে না?

Comments

Popular posts from this blog

মহাকাশে এক বিশাল সমুদ্র

মেরাজের যাত্রা টেলিস্কোপ এবং ধারণার বাইরে