মেরাজের যাত্রা টেলিস্কোপ এবং ধারণার বাইরে

 


"মে'রাজ টেলিস্কোপ এবং ধারণার বাইরের যাত্রা "

ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময় যেন থমকে গেছিল, আর মক্কার বাতাসে এক অদ্ভুত শোকস্তব্ধ নীরবতা নেমে এসেছিল।


এটি ছিল নবুওয়াতের একাদশ বছর, যাকে সীরাতকাররা “শোকের বছর” নামে চিরকালের জন্য ইতিহাসে সংরক্ষণ করেছেন।


একটু কল্পনা করুন সেই ব্যাক্তি ﷺ  যিনি আসমান বাসীর নিকট সন্মানিত, অথচ পৃথিবী তার জন্য সংকীর্ণ করে দেওয়া হচ্ছিল। যার জন্য আসমানসমূহ সাজানো হয়েছিল, তাকেই মক্কার গলিতে গলিতে কটূক্তি করা হচ্ছে।


দুনিয়াতে তখন তার মাত্র দুটি বাহ্যিক আশ্রয় ছিল।

একটি ছিল স্নেহের ছায়া আবু তালিব, যিনি কুরাইশদের আক্রমণের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতেন।

অন্যটি ছিল বিশ্বস্ততার প্রতিমূর্তি খাদিজাতুল কুবরা, যিনি নবুওয়াতের কপালের ঘাম মুছে দিতেন এবং সমগ্র পৃথিবী অস্বীকার করলেও যিনি দৃঢ়ভাবে সত্যায়ন করতেন।


মৃত্যুর নিষ্ঠুর হাত একে একে এই দুই ঢাল কেড়ে নিল।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একা হয়ে গেলেন।


মক্কার নেতারা তখন অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আবু লাহাবের ধূর্ত হাসি প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—


এখন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পূর্ণ অসহায়।


মনের সান্ত্বনার জন্য তিনি তায়েফের সফরে গেলেন। আশা ছিল, হয়তো সেখানে কেউ আল্লাহর নাম নেওয়ার মতো মানুষ পাওয়া যাবে। কিন্তু সেখানে তিনি কী পেলেন?


পাথর, গালি আর রক্তাক্ত জুতো।


যখন তিনি মাটিতে সিজদায় পড়ে নিজের রবের কাছে অভিযোগ নয়, বরং নিজের দুর্বলতার কথা জানাচ্ছিলেন


হে আল্লাহ, আমি আমার দুর্বলতার অভিযোগ তোমার কাছেই পেশ করছি


তখন আরশ যেন  কেঁপে যাচ্ছিল।


এটাই ছিল সেই সবচেয়ে সংবেদনশীল মানসিক ও আবেগঘন মুহূর্ত, যখন সৃষ্টিকর্তা সিদ্ধান্ত নিলেন' আজ পৃথিবীবাসীকে দেখিয়ে দেওয়া হবে, যাকে তারা মাটির মানুষ ভেবে অপমান করছে, আসমানে তার মর্যাদা কত উঁচু।


পৃথিবীর মানুষ যদি তাদের দরজা বন্ধ করে দেয়, তাতে কী?

আজ আমরা তার জন্য সাত আসমান, সিদরাতুল মুন্তাহা ও আরশে আযীমের সেই দরজা খুলে দেব, যা জিবরাইলের জন্যও খোলা হয় না।


এই রাত সান্ত্বনার রাত ছিল না।

এটি ছিল রাজ্যাভিষেকের রাত।


আল্লাহ তার প্রিয়কে বান্দা মুহাম্মদ ﷺ কে ডেকে বললেন


হে প্রিয়, দুঃখ করো না। যদি মক্কার জমিন তোমার জন্য সংকীর্ণ হয়, তবে দেখো—সমগ্র কায়েনাতই তোমার মালিকানাধীন।


মেরাজ ছিল তায়েফের পাথরের জবাব।

এটা প্রমাণ করার জন্য যে পাথর নিক্ষেপকারীরা কত নিচে আর পাথর সহ্যকারী কত উচ্চতায়।


রাতের শেষ প্রহর। কায়েনাত মহাবিশ্ব ছিল শান্ত।

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবাঘরের হাতীম অংশে, অথবা কোনো বর্ণনা অনুযায়ী উম্মে হানীর ঘরে বিশ্রামে ছিলেন। ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থা।


হঠাৎ ছাদ বিদীর্ণ হলো।

এটি কোনো সাধারণ ছাদ ভাঙা ছিল না। এটি ছিল এই ইঙ্গিত যে আজ বস্তুজগতের সীমা সরে যাবে এবং অদৃশ্য জগত প্রকাশ পাবে।


জিবরাইল ও মিকাইল আলাইহিমুস সালাম অবতরণ করলেন।


এই অবতরণ কোনো ওহি আনার জন্য ছিল না, বরং এক রাজকীয় অতিথিকে প্রস্তুত করার জন্য।


সফরের শুরুতে এমন এক ঘটনা ঘটল, যা যুক্তিবাদী ও আধুনিক বিজ্ঞানে মুগ্ধ মন সহজে মেনে নিতে পারে না, কিন্তু আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তা ছিল অপরিহার্য। সেই ঘটনা ছিল বক্ষ বিদীর্ণ করা।


জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। পবিত্র হৃদয়টি বের করে আনা হলো।


ভাবুন সেই দৃশ্যের ভয়াবহতা।

সমগ্র কায়েনাতের সবচেয়ে মূল্যবান হৃদয় জিবরাইলের হাতে।


তা যমযমের পানি দিয়ে ধোয়া হলো।


কেন?


কোনো অপবিত্রতা ছিল কি?

না।


এই ধোয়া ছিল সেই আসন্ন মহাজাগতিক চাপ ও ইলাহী তাজাল্লি সহ্য করার প্রস্তুতি, যা সামনে আসছিল।


এরপর একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হলো, যা ঈমান ও হিকমতে পরিপূর্ণ ছিল। এটি কোনো রূপক ছিল না। এটি ছিল এক আধ্যাত্মিক প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হৃদয়কে আরও শক্তিশালী করা হলো।


আজ বিজ্ঞান বলে, মানুষ যদি মহাকাশে যায়, তবে বিশেষ স্যুট ছাড়া তার শিরা উপশিরা ফেটে যাবে।


আর মেরাজ তো ছিল মহাকাশেরও ঊর্ধ্বে, সময় ও স্থানের সীমার বাইরে এক সফর।


একজন মানুষের দেহ কীভাবে এই নূরানি সফর সহ্য করত?


বক্ষ বিদীর্ণ করা ছিল সেই ইলাহী অস্ত্রোপচার, যা বস্তুগত দেহকে নূরানি সূক্ষ্মতায় রূপান্তরিত করেছিল, যেন আল্লাহর সামনে গিয়ে পুড়ে না যায়, বরং হাসিমুখে কথা বলতে পারে।


এরপর বাহন আনা হলো।


তার নাম ছিল বুরাক।


বর্ণনায় এসেছে, সে ছিল খচ্চরের চেয়ে ছোট এবং গাধার চেয়ে বড় এক সাদা বাহন।


কিন্তু সাবধান।

একে শুধু প্রাণী ভাববেন না।


তার নামই তার বাস্তবতা প্রকাশ করে। বুরাক শব্দটি এসেছে বিদ্যুৎ থেকে।


চৌদ্দশো বছর আগে, যখন আইনস্টাইনের জন্মও হয়নি, যখন আলোর গতির ধারণাও মানুষের ছিল না, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছিলেন সেই বাহনের সম্পর্ক আলো ও বিদ্যুতের গতির সঙ্গে।


هَكَذَا خَطْوُهُ مَدُّ بَصَرِهِ

হাদিসে এসেছে


তার  পা পড়ত সেখানে, যেখানে তার দৃষ্টি পৌঁছাত।


আজ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান বলে, আলোর চেয়ে দ্রুত কিছু নেই, এবং আলোর গতিতে চললে সময় থেমে যায়।


বুরাক ছিল আল্লাহর সৃষ্ট এক বিশেষ জীবন্ত প্রযুক্তি, যা বস্তুদেহকে আলোর গতিতে বা তারও বেশি গতিতে চলতে সক্ষম করেছিল।


এরপর শুরু হলো সফরের প্রথম ধাপ—মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস।


বুদ্ধিজিবীরা প্রশ্ন তোলে আল্লাহ যদি নবীকে আসমানে তুলতেই চাইতেন, তবে সরাসরি মক্কা থেকেই কেন নয়? মাঝখানে জেরুজালেম কেন?




সফরের প্রথম ধাপ “ইসরা” (রাত্রিকালীন স্থলভিত্তিক সফর) শুরু হলো—মক্কা থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস (জেরুজালেম) পর্যন্ত।


এখানে যুক্তি প্রশ্ন তোলে

যদি আল্লাহ তাআলা নবী ﷺ-কে আসমানে ডাকারই ইচ্ছা করতেন, তবে সরাসরি মক্কা থেকেই কেন তাঁকে উপরে তুলে নেওয়া হলো না?

মাঝখানে জেরুজালেমে এই “স্টপ” কেন?

এই “ডিট্যুর”-এর যৌক্তিকতা কী?


এখানে আমার কলম থেমে আপনাদের কাছে এর “ভূ-রাজনৈতিক (জিও-পলিটিক্যাল)” ও “ঈশ্বরিক (ইলাহি)” প্রজ্ঞা ব্যাখ্যা করতে চায়।


জেরুজালেম শুধু একটি শহর নয়; হাজার হাজার বছর ধরে এটি নবুয়তের কেন্দ্র ছিল।

ইবরাহিম (আ.), ইসহাক (আ.), ইয়াকুব (আ.), দাউদ (আ.), সুলায়মান (আ.), যাকারিয়া (আ.) ও ঈসা (আ.)—এঁরা সবাই এই ভূখণ্ডের আমানতদার ছিলেন।

এটি ছিল বনি ইসরাইলের সদর দপ্তর।


আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী ﷺ-কে আসমানে নিয়ে যাওয়ার আগে এই ঘোষণা দিতে চেয়েছিলেন যে—আজ নবুয়তের আমানত, আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র এবং নেতৃত্বের মুকুট আনুষ্ঠানিকভাবে বনি ইসরাইলের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বনি ইসমাইলের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

এটি শুধু একটি সফর ছিল না—এটি ছিল ক্ষমতার স্থানান্তর (Shift of Power)।


যখন নবী ﷺ মসজিদে আকসার দরজায় পৌঁছালেন, তখন সেখানে এক বিস্ময়কর দৃশ্য ছিল।

রাতের অন্ধকার সত্ত্বেও সেখানে এক নূরানী সমাবেশ

আদম (আ.) থেকে ঈসা (আ.) পর্যন্ত এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে পবিত্র সমাবেশ।


সবাই অপেক্ষায় ছিলেন

কার?

তাঁদের ইমামের।


যেই মুহূর্তে মুহাম্মদ আরবি ﷺ প্রবেশ করলেন, জিবরাঈল (আ.) তাঁর হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিলেন।

এই নামাজ কেবল ইবাদত ছিল না—এটি ছিল বায়আত।


সেই রাতে সকল নবী ﷺ-এর পেছনে নামাজ আদায় করে সাক্ষ্য দিলেন যে, তিনিই সাইয়্যিদুল মুরসালিন, তিনিই সেই আহমদ, যার সুসংবাদ তাওরাত ও ইনজিলে দেওয়া হয়েছিল।


আজ যদি মূসা (আ.) জীবিত থাকতেন, তিনিও এই শরিয়তের অনুসারী হতেন।

এই ইমামতি প্রমাণ করে দিল যে ইসলাম কোনো নতুন ধর্ম নয়; বরং এটি সেই ধারাবাহিকতার শেষ ও পূর্ণাঙ্গ কড়ি, যার সূচনা আদম (আ.) করেছিলেন।


মসজিদে আকসায় সেই রাতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সব এক কাতারে দাঁড়িয়েছিল।


নামাজের পর একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, যা প্রায়ই উপেক্ষিত হয়—

নবী ﷺ বলেছেন,

“আমি বুরাককে সেই আংটিতে বেঁধেছিলাম, যেখানে নবীরা তাঁদের বাহন বেঁধে রাখতেন।”

(সূত্র: সুনানে নাসাঈ, হাদিস ৪৫০)


একটু ভেবে দেখুন!

যে বাহন জান্নাত থেকে এসেছে, যার সঙ্গে জিবরাঈল (আ.)-এর মতো রক্ষক রয়েছেন, যা আল্লাহর অনুমতি ছাড়া নড়তেও পারে না—তাকে বেঁধে রাখার কী প্রয়োজন ছিল?

সে কি পালিয়ে যেত?


এখানে নবী ﷺ উম্মতকে কারণ গ্রহণ ও তাওয়াক্কুলের পার্থক্য শিক্ষা দিয়েছেন।

তিনি বোঝালেন—তোমরা আসমানের যাত্রী হলেও, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস যতই দৃঢ় হোক, এই দুনিয়ার কারণ-কার্য নীতি (Law of Causality) অবহেলা করা যাবে না।


উটের হাঁটু বেঁধে রাখা তাওয়াক্কুলের বিরোধী নয়; বরং সেটাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।

মেরাজের সেই নূরানী সফরেও তিনি উম্মতকে দুনিয়াবি বাস্তবতার শিক্ষা দিতে ভোলেননি।


এবার স্থলভ্রমণ শেষ। ইমামতি সম্পন্ন।

পৃথিবী সাক্ষ্য দিল—তার উত্তরাধিকারী এসে গেছেন।

এখন সময় সেই লাফের, যা মাধ্যাকর্ষণের শিকল ভেঙে, সময়ের রশি টেনে, সেই পরিপূর্ণ মানুষটিকে সেখানে নিয়ে যাবে—যেখানে ফেরেশতারাও “ডানা পুড়ে যাওয়ার” ভয়ে থেমে যায়।


বাইতুল মুকাদ্দাসের পাথর থেকেই শুরু হলো সেই সফর, যাকে পরিভাষায় বলা হয় “মেরাজ”।


একটু শব্দটির দিকে খেয়াল করুন!

আল্লাহ তাআলা এখানে “طيران” (উড়ে যাওয়া)  শব্দ ব্যবহার করেননি; বরং বেছে নিয়েছেন معرج মেরাজ”।  مفعل মিফআলুনের ওজনে।

আরবী ব্যাকরণে ইহাকে ইসমে আলা اسم  ألَه বলে যার অর্থ যন্ত্রবাচক জিনিস বুঝায়। সুতরাং معرج মেরাজের মানে 

“যে মাধ্যম বা সিঁড়ির সাহায্যে উপরে ওঠা হয়।”


এই শব্দই প্রমাণ করে যে এটি কেবল বাতাসে ভেসে যাওয়া ছিল না; বরং এটি ছিল একটি সুশৃঙ্খল, হাই-টেক ও বহু-মাত্রিক (ডাইমেনশনাল) সফর, যার জন্য বিশেষ এক “কসমিক এলিভেটর” ব্যবহৃত হয়েছিল।


এই প্রযুক্তি ছিল এমন, যা ভৌত দেহকে এক মাত্রা থেকে অন্য মাত্রায় স্থানান্তরের জন্য অপরিহার্য।


যখন নবী করিম ﷺ ও জিবরাঈল (আ.) সেই নূরানী সিঁড়ি দিয়ে আকাশ চিরে উপরের দিকে উঠতে লাগলেন, তখন পৃথিবী চোখের সামনে একটি ছোট বলের মতো হয়ে মিলিয়ে গেল।


এখন সামনে ছিল সেই জগৎ, যাকে আমরা “ঊর্ধ্বজগৎ” বলি—যা আমাদের টেলিস্কোপ ও বুদ্ধির সীমার বাইরে।


যখন এই কাফেলা প্রথম আসমানের সীমানায় পৌঁছাল, সেখানে এক বিস্ময়কর সংলাপ হলো।

এই সংলাপ আমাদের মহাবিশ্বের প্রশাসনিক কাঠামো বুঝতে সাহায্য করে।


জিবরাঈল (আ.) প্রথম আসমানের দরজায় কড়া নাড়লেন।

ভেতর থেকে আওয়াজ এলো—

“কে?”


তিনি বললেন—

“আমি জিবরাঈল।”


জিজ্ঞেস করা হলো—

“আপনার সঙ্গে কে?”


উত্তর এলো—

“মুহাম্মদ ﷺ।”


এরপর সেই প্রশ্ন করা হলো, যা মহাবিশ্বের শৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি—

“أَوَقَدْ بُعِثَ إِلَيْهِ؟”

(তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? / তাঁর জন্য কি অনুমতি জারি হয়েছে?)


জিবরাঈল (আ.) বললেন

“হ্যাঁ, তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ডাকা হয়েছে।”


তখন দরজা খুলে গেল এবং আওয়াজ এলো—

“ مَرْحَبًا بِهِ وَلَنِعْمَ الْمَجِيءُ جَاءَ“

স্বাগতম কতই না উত্তম আগমনকারী।

(সূত্র: সহিহ বুখারি, কিতাবু বদউল খালক, হাদিস ৩২০৭)


এখানে আবার প্রশ্ন জাগে—

আসমানের প্রহরী ফেরেশতারা কি জানতেন না যে তিনি মুহাম্মদ ﷺ?

তারা কি অবগত ছিলেন না?


অবশ্যই ছিলেন!

কিন্তু এই সংলাপের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে


এটি একটি হাই সিকিউরিটি জোন।

এখানে সবকিছু নিয়ম ও প্রোটোকল অনুযায়ী চলে।


জিবরাঈল (আ.)-এর মতো নিকটতম ফেরেশতাকেও অনুমতি নামা দেখাতে হয়।


এই প্রশ্ন

“أَوَقَدْ بُعِثَ إِلَيْهِ؟”

এর অর্থ ছিল—এই ভৌত মানবদেহকে ঊর্ধ্বজগতে প্রবেশের জন্য বিশেষ অনুমতি (Special Permit) দেওয়া হয়েছে কি না।


এই মহাবিশ্ব অন্ধ ও বধির নয়; বরং এটি কঠোর শৃঙ্খলার অধীন।






নবী করীম ﷺ-এর সফর অব্যাহত রইল। প্রত্যেক আসমানে একজন বিশেষ নবীর সাথে সাক্ষাৎ হল। এই সাক্ষাৎগুলো কোনো সাধারণ বা এলোমেলো (random) বিষয় ছিল না, বরং এতে গভীর কৌশলগত এবং ঐতিহাসিক হিকমত লুকিয়ে ছিল। আসুন এই সাক্ষাৎগুলোর পর্যালোচনা করি।


প্রথম আসমান (হযরত আদম আ.): এখানে মানবজাতির পিতা হযরত আদম আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ হল। ডান দিকে তাকালে হাসছিলেন (জান্নাতী আত্মা), বাম দিকে তাকালে কাঁদছিলেন (জাহান্নামী আত্মা)।


হিকমত: সফরের শুরুতে পিতা-র সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে এই বার্তা দেওয়া হল যে, হে মুহাম্মদ ﷺ! আপনার মিশন সেই সিলসিলার পরিপূর্ণতা যা এই প্রথম মানুষ থেকে শুরু হয়েছিল। এটি সমগ্র মানবজাতির ঐক্য (Unity of Mankind)-এর প্রতীক ছিল।


দ্বিতীয় আসমান (হযরত ঈসা আ. ও ইয়াহইয়া আ.): এখানে দুই খালাতো ভাইয়ের সাক্ষাৎ হল। হযরত ঈসা আ., যিনি রূহুল্লাহ এবং পুনরায় আসবেন, এবং হযরত ইয়াহইয়া আ., যিনি যৌবনে হকের জন্য গর্দান কাটিয়ে দিয়েছিলেন।


হিকমত: এটি ইঙ্গিত ছিল যে, আপনার ﷺ উম্মতকে হযরত ঈসা আ.-এর মতো আধ্যাত্মিকতা এবং হযরত ইয়াহইয়া আ.-এর মতো কুরবানীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। আর যেহেতু আখিরী যামানায় হযরত ঈসা আ. আপনার ﷺ শরীয়ত কায়েম করবেন, এটি এক প্রকার নেতৃত্বের পরামর্শ ছিল।


তৃতীয় আসমান (হযরত ইউসুফ আ.): যাঁকে দুনিয়ার অর্ধেক সৌন্দর্য দেওয়া হয়েছিল।


হিকমত: হযরত ইউসুফ আ.-এর জীবন দেখুন ভাইয়েরা কূপে ফেলে দিয়েছিল, গোলাম বনে গিয়েছিলেন, জেল খেটেছিলেন, কিন্তু শেষে মিসরের সিংহাসনে বসেছিলেন। এই সাক্ষাৎ নবী ﷺ-এর জন্য সুসংবাদ ছিল। আল্লাহ বলছিলেন:  


হে আমার প্রিয়! আজ মক্কাবাসীরা তোমাকে ইউসুফের মতো বের করে দিচ্ছে, কষ্ট দিচ্ছে, কিন্তু অচিরেই তুমি বিজয়ী হয়ে মক্কায় প্রবেশ করবে যেমন ইউসুফ মিসরে প্রবেশ করেছিলেন। এটি ফতহে মক্কা-র ট্রেলার ছিল।


যখন সফর তৃতীয় আসমান (ইউসুফ আ.) থেকে এগিয়ে গেল, তখন চতুর্থ ও পঞ্চম আসমানে দুই এমন সত্তার সাথে সাক্ষাৎ হল যাঁরা নবুয়তের দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ—ইলম এবং মহব্বত—এর আমানতদার ছিলেন।


চতুর্থ আসমান (হযরত ইদরীস আ. এবং রফআতে মাকান): চতুর্থ আসমানে সৈয়দুনা ইদরীস আ. উপস্থিত ছিলেন। ইদরীস আ. প্রথম নবী যিনি কলম দিয়ে লিখেছিলেন। তিনি জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy) এবং গণিতের (Mathematics) মাহির ছিলেন।  


নবী করীম ﷺ যখন তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন, তিনি মারহাবা বললেন। এখানে একটি বড় জ্যামিতির হিকমত লুকিয়ে আছে। সাত আসমানের মাঝে চতুর্থ আসমান ঠিক মধ্যবর্তী (Center) অবস্থানে (তিনটি নিচে, তিনটি উপরে)।  


আল্লাহ তা'আলা কুরআনে ইদরীস আ.-এর সম্পর্কে বলেছেন:  


وَرَفَعْنَاهُ مَكَانًا عَلِيًّا  

(আমরা তাঁকে উচ্চ মাকামে উঠিয়েছি)। [সূরা মারিয়াম: ৫৭]  


সূর্যকেও প্রাচীন জ্যোতির্বিদ্যায় সৌরজগতের চতুর্থ ফলকে বিবেচনা করা হত।


হিকমত: ইদরীস আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ নবী করীম ﷺ-কে এই ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, যেমন ইদরীস আ. ইলম ও কলমের কারণে উচ্চ মর্যাদা পেয়েছিলেন, আপনার ﷺ উম্মতও ইকরা (পড়ো) এবং কলম দিয়ে উচ্চ মর্যাদা লাভ করবে। এটি ইলমী উত্থান-র সুসংবাদ ছিল। আপনাকে ﷺ নবুয়তের কেন্দ্রে (Centrality) দেখানো হয়েছে যে, আপনি সমস্ত ইলমের উৎস।


পঞ্চম আসমান (হযরত হারুন আ. এবং জনপ্রিয়তা): পঞ্চম আসমানে সৈয়দুনা হারুন আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ হল। 

  জিবরাঈল আ. বললেন:  


ইনি হারুন আ., যিনি নিজের কওমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুহিব পছন্দনীয়।


হিকমত: হারুন আ. মূসা আ.-এর ভাই ও ওজির ছিলেন। 


নবী করীম ﷺ-কে এখানে হারুন আ.-এর সাথে মিলিয়ে সফট পাওয়ার (Soft Power)-এর দরস দেওয়া হল। যে, হে প্রিয় ﷺ! আগে চললে আপনাকে মদীনার রাষ্ট্র গড়তে হবে, সেখানে মূসা আ.-এর মতো সন্মানিত সায়্যিদ দরকার হবে (আইন কায়েম করার জন্য) এবং হারুন আ.-এর মতো নরমতাও দরকার হবে ( অন্তর জোড়ার জন্য)। 


ষষ্ঠ আসমান (হযরত মূসা আ.): এখানে এক অদ্ভুত ও হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য হল। কালীমুল্লাহ মূসা আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ হল, এবং যখন নবী ﷺ এগিয়ে গেলেন তখন মূসা আ.-এর চোখে অশ্রু চলে এল।  


জিজ্ঞাসা করা হল: হে মূসা! কাঁদছেন কেন?  


তিনি বললেন: এই যুবক (মুহাম্মদ ﷺ) যিনি আমার পরে  এসেছেন, তার উম্মতের লোকেরা আমার উম্মত থেকে বেশি জান্নাতে যাবে।  


এই কান্না হিংসা-র ছিল না, এটি  ছিল رشک রশক এবং নিজের কওম (বনী ইসরাঈল)-এর দুর্ভাগ্যের উপর আফসোসের ছিল।  


মূসা আ. নিজ  কওমের উপর অনেক মেহনত করেছিলেন কিন্তু তারা নাফরমান বেরিয়েছে। আজ তিনি দেখছিলেন যে মুহাম্মদ ﷺ-এর উম্মত, যারা শেষ, তারাই সাফল্য হয়েছে।। এটি নবী ﷺ-এর জন্য একটি বিরাট সম্মান  ছিল।


সপ্তম আসমান (হযরত ইবরাহীম আ.): নবীদের পিতা। তিনি বাইতুল মা'মূর এর সাথে টেক লাগিয়ে বসে ছিলেন।


হিকমত: ইবরাহীম আ. যমীনে কা'বা নির্মাণ করেছিলেন, আর এখন তিনি প্রতিদানস্বরূপ আসমানী কা'বা (বাইতুল মা'মূর)-এর পাশে উপস্থিত ছিলেন। নবী ﷺ-কে সেখানে মিলিয়ে এই সনদ দেওয়া হল যে  


আপনিই ইবরাহীম আ.-এর প্রকৃত ওয়ারিস এবং দীনে হানীফীর আমানতদার।


সপ্তম আসমানে নবী করীম ﷺ-কে বাইতুল মা'মূর (The Much-Frequented House) দেখানো হল। এটি যমীনের কা'বার ঠিক উপরে (Parallel)। রেওয়ায়াতে আছে যে যদি এটি পড়ে যায় তাহলে সোজা কা'বার উপর পড়বে।


এখানে নবী ﷺ এমন দৃশ্য দেখলেন যা মানুষের কল্পনাকে স্তব্ধ করে দেয়।  


বললেন: এই ঘরে প্রতিদিন ৭০,০০০ ফেরেশতা তাওয়াফের জন্য প্রবেশ করে এবং যে একবার বের হয়ে যায়, কিয়ামত পর্যন্ত তারা আর প্রবেশ করতে পাই  না।  


(হাদীস: সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, হাদীস নং ১৬২)


একটু ক্যালকুলেটর নিন এবং হিসাব করুন!  


মহাবিশ্বের প্রথম দিন থেকে কিয়ামত পর্যন্ত, প্রতিদিন ৭০ হাজার নতুন ফেরেশতা। এটি কোটি-কোটি নয়, বরং অগণিত সংখ্যা।  


এই হাদীস আমাদের বলে যে এই কাইনাত মহাবিশ্ব খালি নয়, এটি নির্জন নয়, বরং এটাও একটা বাসজগত (ফেরেশতা) দিয়ে এত ভরা যে সেখানে স্থান নেই।  


আমাদের যমীনে বসে এই অহংকার করা যে শুধু আমরাই আছি, এটি আমাদের অজ্ঞতা। আল্লাহর রাজত্ব এত বিশাল যে আমাদের যমীন তার সামনে মরুভূমির একটি কণার মর্যাদাও রাখে না।


তারপর সপ্তম আসমান থেকেও উপরে, নবী করীম ﷺ-কে সেই মাকামে নেওয়া হল যাকে কুরআন সিদরাতুল মুনতাহা বলেছে।  


সিদরাত অর্থ বেরি গাছ এবং মুনতাহা অর্থ সীমা/অন্ত (The Utmost Boundary)।  


এটি সেই মাকাম যেখানে সৃষ্টির ইলম, আমল ও পৌঁছানোর সীমা শেষ হয়ে যায়।  


যমীন থেকে যা উপরে যায়, তা এখানে থেমে যায়। উপর (আরশ) থেকে যা হুকুম নিচে আসে, তা প্রথমে এখানে গ্রহণ করা হয়।  


এটি মহাবিশ্বের ইভেন্ট হরাইজন (Event Horizon)। এটি সৃষ্ট কাইনাতের সীমানা।  


এই গাছের পাতা হাতির কানের মতো এবং ফল বড় মটকার মতো ছিল। যখন আল্লাহর নূর তাকে ঢেকে দিল তখন তার রং এমন বদলে গেল যে কোনো মানুষের চোখ বা জিহ্বা সেই সৌন্দর্য বর্ণনা করতে পারে না। এটি সেই মাকাম যেখানে ফিজিক্স শেষ হয় এবং মেটাফিজিক্স-র রাজত্ব শুরু হয়।


এখানে ইতিহাসের সেই মুহূর্ত এল যা মানুষ (বশর)-এর মহত্ত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছে জিবরাঈল আমীন আ., যাঁর ছয়শো ডানা আছে এবং যিনি কাইনাতের সবচেয়ে শক্তিশালী ফেরেশতা, তিনি থেমে গেলেন।  


নবী ﷺ জিজ্ঞাসা করলেন:  


হে জিবরাঈল! এমন মাকামে কি বন্ধু বন্ধুকে ছেড়ে দেবে?  


জিবরাঈল আ. কাঁপতে কাঁপতে বললেন:  


হে মুহাম্মদ ﷺ! এটি আমার সীমা। যদি আমি এখান থেকে এক অঙ্গুলির অগ্রভাগও এগিয়ে যাই, তাহলে আল্লাহর নূরের তাজাল্লী আমার ডানাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। এটি আপনারই মাকাম, আপনি এগিয়ে যান, আল্লাহ আপনার জন্য রাস্তা খুলে দিয়েছেন।  


এখানে একটি ইলাহিয়াতী নুকতা লক্ষ্য করুন:  


জিবরাঈল আ.  যিনি ফেরেশতাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ , আল্লাহর নিকট সম্মানীয় এবং পছন্দনীয়  তিনি থমকে গেলেন।।  


।  


এই দৃশ্য বলে যে মানুষ (বশর)-এর সম্ভাবনা ফেরেশতা (নূরী সৃষ্টি) থেকে বেশি। ফেরেশতা মজবূর, তার লিমিট ফিক্স। মানুষ আশরাফ সন্মানিত, তার জন্য এমন রাস্তা খুলে দেওয়া হয় যা কল্পনাতীত।  


ইকবালের কথায়:  


اگر یک سرِ مُو برتر پَرم  

فروغِ تجلی بسوزد پَرم  


এখন জিবরাঈল আ.ও পিছনে রয়ে গেলেন। সওয়ারীও সম্ভবত সেখানেই থেমে গেল।  


এখন নবী করীম ﷺ একা ছিলেন। একাকী। যেখানে না আওয়াজ ছিল, না হাওয়া, না সময়, না দিক।  


শুধু এক খালিক এবং এক আবদ বান্দা!


সিদরাতুল মুনতাহা, সেই বেরি গাছ যা কাইনাতের  শেষ সীমা, পিছনে রয়ে গেছে।  


জিবরাঈল আমীন আ., যিনি নূরী সৃষ্টির সর্দার, নিজের সীমায় থেমে নম্রতার স্বীকারোক্তি করে দিয়েছেন।  


এখন সামনে কোনো বস্তুগত রাস্তা ছিল না, কোনো দিক ছিল না, কোনো উপর বা নিচ ছিল না।  


 এটি সেই  জায়গা যেখানে সময় (Time)-এর অস্তিত্ব শেষ হয়ে গেছে, এখানে জায়গার (Space) মাপকাঠি ভেঙে গেছে।  


এক অদ্ভুত নীরবতা ও ভয়াবহতা ছিল। এই মাকামে জায়গায় নবী করীম ﷺ একা ছিলেন। একাকী। কোনো গাইড ছাড়া।  


এই একাকীত্ব ভয়ঙ্কর ছিল না, বরং এটি মাহবুবের ভালোবাসার একাকিত্ব ছিল ।   এক বশর, মাটির তৈরি মানুষ, সেই মাকামে পা রাখছে যেখানে নূরী ফেরেশতারাও পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এটি মানুষের মহত্ত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল।


এই একাকী সফরে সবচেয়ে প্রথম এক আওয়াজ শোনা গেল,  


صَرِيفَ الْأَقْلَامِ (কলমের চলার আওয়াজ)।  


(হাদীস: সহীহ বুখারী, কিতাবুস সালাত, হাদীস নং ৩৪৯)


এই আওয়াজ কী ছিল?  


এটি কাইনাতের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ হেডকোয়ার্টার-র আওয়াজ ছিল। সেই কলম যা আল্লাহর হুকুমে কাইনাতের তকদীর লিখছে, যা গ্যালাক্সির ঘূর্ণন, তারার মৃত্যু-জীবন, এবং মানুষের রিযিক ও মৃত্যুর ফয়সালা লিখছে, তাদের সরসরাহট ছিল।  


বিজ্ঞানীরা আজ ইনফরমেশন থিয়োরির কথা বলে যে কাইনাত আসলে বস্তু নয়, বরং ডেটা এবং ইনফরমেশন।  


১৪০০ বছর আগে মি'রাজের যাত্রী বলে দিয়েছেন যে এই কাইনাতের পিছনে এক কলম (Source Code Writer) আছে যা অবিরত চলছে।  


এই কাইনাত অটো পাইলট-এ নেই, এটিকে মুহূর্তে মুহূর্তে লেখা ও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।  


নবী করীম ﷺ-কে এই আওয়াজ শুনিয়ে আসলে অথরিটেটিভ অ্যাক্সেস দেওয়া হয়েছে যে দেখো! কাইনাতের কন্ট্রোল রুম এখানে।


اردو تحریر سر بلال شوکت آزاد


أمنت بالله و رسله 

اللهم إني أعوذ بك أن أشرك بك شيئًا وأنا أعلم، وأستغفرك لما لا أعلم


Comments

Popular posts from this blog

মহাকাশে এক বিশাল সমুদ্র

আমি কেন আল্লাহকে মানি ?