যে রক্ষী গুয়ানতানামোতে বন্দীদের পাহারা দিত, একদিন সেই কুরআনের ছায়ায় রক্ষা পেল
"যে রক্ষী গুয়ানতানামোতে বন্দীদের পাহারা দিত, একদিন সেই কুরআনের ছায়ায় রক্ষা পেল
"
টেরি হোল্ডব্রুক—মাত্র উনিশ বছরের এক আমেরিকান যুবক। জীবনের পরিচয় ছিল ট্যাটু, মদ, যৌনতা আর রক অ্যান্ড রোলের উন্মত্ততায় ডুবে থাকা। মনে ছিল না কোনো স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস, আলোর কোনো ধারণা—শুধুই অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা। সময়টা ২০০৩ সাল।
কিন্তু আল্লাহ যাকে ডাকেন, তার জন্য পথ খুলে যায় এমন জায়গা থেকেও—যেখানে কেউ কল্পনাও করতে পারে না।
অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা
১৯৮৩ সালে অ্যারিজোনায় জন্ম নেওয়া টেরির পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় মাত্র সাত বছর বয়সে। বাবা-মা তাকে ফেলে আলাদা পথে চলে যান। দাদার ঘরে বেড়ে ওঠা টেরির মনে কেমন এক শূন্যতা জমে ছিল, যা মদ আর উচ্ছৃঙ্খলতায় ভরিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন।
২১ বছর বয়সে জীবনে কিছু একটা করার তাগিদে যোগ দেন মিলিটারি পুলিশের চাকরিতে। এরপর তার নিয়োগ হলো পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর জায়গা—গুয়ানতানামো বে কারাগারে।
ইসলাম সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না তার। বরং তাকে বারবার দেখানো হতো ৯/১১-এর ভয়ংকর দৃশ্য—শেখানো হতো, "এরা মানুষ নয়, এরা তোমাকে দেখলেই মেরে ফেলবে। কথা বলবে না, কাছে যেও না।"
কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই টেরির ভেতরে প্রথম পরিবর্তন শুরু হয়।
নির্যাতনের ভয়াবহতা—তার চোখে দেখা সত্য
টেরি দেখলেন—এখানে বন্দী রয়েছে ১৬ বছরের কিশোর, ট্যাক্সিচালক, ডাক্তার, অধ্যাপক, বৃদ্ধ মানুষ… যাদের অপরাধ প্রমাণিত নয়। তাদের টেনে-হিঁচড়ে নেওয়া হতো ইন্টারোগেশন সেলে। শিকলে বেঁধে হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দেওয়া হতো। ৬-৭ বছর ধরে যাদের রুমের লাইট কখনও নিভেনি—অন্ধকারে ঘুমানোর অধিকারটুকুও ছিল না। মুখের সামনে ৬০ ডিগ্রি আলো, কানের পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গান—এভাবেই চলত নির্যাতন।
কোনো কারণ ছাড়াই দরজার ফাঁকে হাত-পা চেপে ভেঙে ফেলা, মরিচের স্প্রে, কমোডে মাথা ডুবিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা—সব দেখতেন টেরি।
আর তখনই তিনি এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখলেন— কারারক্ষী হয়েও তিনি যেন বন্দী, আর বন্দী হয়েও মুসলিমরা যেন সবচেয়ে স্বাধীন। তাদের চোখে শান্তি, মুখে হাসি—যা টেরির অস্থির জীবনে কখনো ছিল না।
মানুষের কাছ থেকে আল্লাহর পথে
নাইট শিফটে বন্দীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন তিনি—ধর্ম, ইতিহাস, নৈতিকতা—সবকিছু নিয়ে। তাদের সৌজন্য, ধৈর্য এবং ঈমান টেরিকে ছুঁয়ে গেল।
মরোক্কান বন্দী আহমেদ এরাচিদি একদিন তার হাতে তুলে দিলেন একটি কুরআন। টেরি পড়তে শুরু করলেন… আর মনে হলো—এ বইটি যেন তার বহুদিনের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে তার ভিতর আলো জ্বেলে দিচ্ছে। খ্রিস্টধর্ম বা ইহুদিধর্ম তাকে কখনও স্পর্শ করতে পারেনি, কিন্তু ইসলাম তাঁর অন্তরকে ধীরে ধীরে জড়িয়ে ধরল।
তার নিজের ভাষায়— "আমি যতই ইসলামকে জানতে লাগলাম, ইসলাম ততই আমার কাছে আসতে লাগল।"
মদ-নেশা, গান, অশ্লীলতা—সব ধীরে ধীরে ত্যাগ করতে থাকলেন তিনি।
সত্যের ঘোষণা—এক নতুন জন্ম
এক বন্দী তাকে জিজ্ঞেস করল, "ইসলাম গ্রহণ করতে চাইছ? চিন্তা করেছ ভালো করে? মদ ছাড়তে হবে, ট্যাটুর জীবন ছাড়তে হবে। চাকরি হারাতে পারো, পরিবারও ত্যাগ করতে পারে। পারবে?"
টেরির উত্তর ছিল নিঃসংশয়— "হ্যাঁ, আমি পারব।"
অবশেষে ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে তিনি বন্দীদের সামনে উচ্চারণ করলেন শাহাদাহ— "আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল।"
সেই মুহূর্তে বন্দীদের চোখ আনন্দে ঝলমলে হয়ে উঠেছিল। আর টেরি হয়ে গেলেন—মুছত্বফা আবদুল্লাহ।
সহকর্মীদের ভয় করে তাকে গোপনে সালাত পড়তে হতো, বাথরুমে গিয়ে ওজু করতে হতো। ২০০৪ সালে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়—"General Personality Disorder" নামের হাস্যকর অজুহাতে।
আজ তিনি সত্যের পক্ষের একজন সৈনিক
আজ মুছত্বফা আবদুল্লাহ কাজ করছেন Muslim Legal Fund of America-র সঙ্গে— যারা অন্যায়ভাবে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে বন্দী আমেরিকান মুসলিমদের মুক্তির জন্য লড়াই করছেন।
তারই ভাষায়— "গুয়ানতানামোর অস্তিত্ব আমেরিকার জন্য লজ্জার।"
ঐ অন্ধকার কারাগারেই টেরি হোল্ডব্রুক খুঁজে পেয়েছিলেন সেই আলো— যা তার হৃদয়কে বদলে দিয়েছিল চিরতরে।

Comments
Post a Comment