এই পৃথিবী ভিন্ন মত, ভিন্ন ভাষা আর ভিন্ন পরিচয়ে ভরা। কিন্তু কোনো কোনো মানুষের জীবন এমন হয়, যা সব ভেদাভেদ ছাপিয়ে সত্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক নীরব সাক্ষ্য হয়ে ওঠে। অধ্যাপক জোয়েল হেওয়ার্ড ঠিক তেমনই একজন মানুষ—যার জীবন কেবল একাডেমিক সাফল্যের গল্প নয়, বরং এক অন্তরের যাত্রা।
২০২৩ সালে বিশ্বের ৫০০ জন সবচেয়ে প্রভাবশালী মুসলিমকে নিয়ে প্রকাশিত মর্যাদাপূর্ণ গ্রন্থ The Muslim 500-এ তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া হয়তো তাঁর নিজের কাছেই অপ্রত্যাশিত ছিল, কিন্তু এতে কোনো সন্দেহ নেই—এটি তাঁর দীর্ঘদিনের জ্ঞানচর্চা ও অবদানের যথার্থ স্বীকৃতি।
ব্রিটিশ–নিউজিল্যান্ডীয় বংশোদ্ভূত অধ্যাপক হেওয়ার্ড যুদ্ধ ও সামরিক কৌশলের একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ। তাঁর পিতার সামরিক পটভূমি তাঁকে এই বিষয়ে আগ্রহী করে তোলে। তিনি যুদ্ধকে দেখতেন মানুষের চরিত্র পরীক্ষার এক কঠিন ময়দান হিসেবে—যেখানে চরম পরিস্থিতিতে আত্মত্যাগ, ভ্রাতৃত্ব ও সাহসের মতো গুণাবলি উন্মোচিত হয়।
নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে ক্যান্টারবেরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট অর্জনের পর তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লুফটওয়াফের কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা করেন। এরপর যুক্তরাজ্যে দীর্ঘ সময় অধ্যাপনা করেন, এমনকি একটি সামরিক একাডেমিতেও। সামরিক ইতিহাস নিয়ে তাঁর লেখা একাধিক বই তাঁকে একজন প্রতিষ্ঠিত গবেষক হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
তবে ৯/১১–পরবর্তী সময়ে একটি মন্তব্য তাঁ
র জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্য—ইসলামের মধ্যে নাকি জন্মগতভাবে সামরিকতা রয়েছে—এই ধারণা তাকে ভাবিয়ে তোলে। সত্য জানার তাগিদে তিনি ইসলাম সম্পর্কে গভীরভাবে পড়াশোনা শুরু করেন।
কুরআনকে মূল ভাষায় বোঝার জন্য তিনি আরবি ভাষা শেখেন। দীর্ঘ অধ্যয়ন, চিন্তা ও আত্মঅন্বেষণের পর প্রায় দুই দশক আগে 2005 সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্ত তার জীবনে এক গভীর পরিবর্তন এনে দেয় এবং ইসলামি ইতিহাসে তার গবেষণাকে দেয় নতুন দিগন্ত।
২০১০ সালের দিকে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাস শুরু করেন। রাবদান একাডেমিসহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি শিক্ষকতা করেন এবং জ্ঞান বিতরণ করেন তরুণ এমিরাতি শিক্ষার্থীদের মাঝে—যারা আগ্রহ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে শিখতে চায়।
পশ্চিমা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি ও ইসলামের গভীর জ্ঞানের অনন্য সমন্বয়ে অধ্যাপক হেওয়ার্ড এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি উপহার দিয়েছেন, যা খুব কম গবেষকেরই রয়েছে। তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্ত গ্রন্থ “The Leadership of Muhammad: A Historical Reconstruction” তাঁকে ইসলামি ইতিহাসের অন্যতম প্রধান কর্তৃপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ “The Warrior Prophet: Muhammad and War” বহু বছরের গবেষণার ফসল—যেখানে তিনি ইতিহাসের আলোকে নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর যুদ্ধনীতি বিশ্লেষণ করেছেন। বর্তমানে তিনি নবীজির কূটনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে গবেষণা করছেন—কীভাবে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও বাস্তবতাকে বুঝে তিনি জটিল পরিস্থিতিতেও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ দেখিয়েছেন।
ইসলামে প্রবেশের পর অধ্যাপক হেওয়ার্ড এক গভীর ভ্রাতৃত্ববোধ অনুভব করেন—যেখানে বর্ণ, জাতি কিংবা সামাজিক অবস্থান কোনো বাধা নয়। তার কথায়—
“ইসলামের সৌন্দর্য এখানেই—এটি বর্ণের ঊর্ধ্বে, জাতিগত সীমার ঊর্ধ্বে। এটি আমাদের সবাইকে একসূত্রে গেঁথে দেয়, আমাদের পটভূমি বা সামাজিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন।”

Comments
Post a Comment