"ইহুদি ঘর থেকে ইসলামের আঙিনা—পথটা ছিল যুক্তির, গন্তব্যটা ছিল ঈমানের। "
"ইহুদি ঘর থেকে ইসলামের আঙিনা—পথটা ছিল যুক্তির, গন্তব্যটা ছিল ঈমানের। "
লেমবার্গের এক ইহুদি ঘরে জন্ম নিয়েছিল এক শিশু—নাম তার লিওপোল্ড ওয়াইস। দাদার কণ্ঠে রাব্বিনিক ব্যাখ্যা, ঘরের বাতাসে হিব্রু শব্দ, শৈশবেই তাওরাত ও নবীদের কাহিনিতে ডুবে থাকা এক মন। অথচ বড় হতে হতে সেই মন প্রশ্নে ভরে উঠল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের হৃদয় ভেঙে দিয়েছিল—ধ্বংসস্তূপের ভেতর দাঁড়িয়ে মানুষ বেঁচে ছিল, কিন্তু বেঁচে থাকার অর্থ হারিয়ে ফেলেছিল। সভ্যতা ছিল, কিন্তু শান্তি ছিল না। জ্ঞান ছিল, কিন্তু দিশা ছিল না।
ভিয়েনা ও বার্লিনের ক্যাফেগুলোতে তিনি দেখেছিলেন দর্শনের উত্তাপ, শিল্পের উন্মাদনা, বিজ্ঞানের অহংকার—কিন্তু কোথাও আত্মার আশ্রয় খুঁজে পাননি। তার চোখে ইউরোপ ছিল এক ঝকঝকে শূন্যতা—বাইরে আলো, ভেতরে ক্লান্ত অন্ধকার।
১৯২২ সালে, মাত্র বাইশ বছর বয়সে, তিনি যাত্রা করলেন ফিলিস্তিনের পথে—তখন যা ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। মরুভূমির বাতাস তাঁর মুখে লাগতেই যেন ইতিহাস কথা বলতে শুরু করল। বেদুইনদের তাঁবুতে তিনি দেখলেন সেই মানুষগুলোকে, যাদের কথা তিনি শৈশবে পড়েছিলেন—ইব্রাহিম, মূসা, ইসহাকের উত্তরাধিকার যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। সরলতা, সম্মান, আতিথেয়তা—এখানে বিশ্বাস ছিল জীবন, আর জীবন ছিল বিশ্বাস।
তিনি দেখলেন, আধুনিক জাতীয়তাবাদের নামে কেমন করে অন্যায় চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে দুর্বলদের ওপর। ইউরোপীয় শক্তির ছত্রচ্ছায়ায় এক জাতিকে উৎখাত করার প্রচেষ্টা তার বিবেককে আহত করল। ন্যায়ের প্রশ্নে তিনি নিরপেক্ষ থাকতে পারেননি—তিনি নিলেন সত্যের পক্ষ।
ইসলাম তখনও তার ধর্ম নয়, কিন্তু তাঁর হৃদয়ের খুব কাছে। চার বছর ধরে ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইরাক, মিসর ও আরব ভূমির পথে পথে হাঁটতে হাঁটতে কুরআনের ভাষা তাঁর ভেতরে নীরবে জায়গা করে নিচ্ছিল—যুক্তিকে অস্বীকার করে নয়, যুক্তিকে পূর্ণতা দিয়ে।
তারপর এল সেই দিন—১৯২৬ সালের সেপ্টেম্বর, বার্লিনের এক U-Bahn ট্রেন। চারপাশে স্বচ্ছল মানুষ, অথচ মুখে ক্লান্তি, চোখে শূন্যতা। তিনি অনুভব করলেন—এই সভ্যতা মানুষকে সব দিয়েছে, শুধু আত্মাকে দেয়নি।
সেদিন ঘরে ফিরে তিনি কুরআন খুললেন। চোখ পড়ল সূরা আত-তাকাসুরে, বিশেষ করে এই দুই আয়াতে—
“أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ حَتَّىٰ زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ”
“অধিক পাওয়ার প্রতিযোগিতা তোমাদের বিভ্রান্ত করে রেখেছে। যতক্ষণ না তোমরা কাবরসমূহে উপস্থিত হচ্ছ।
(সূরা আত-তাকাসুর, ১০২:১–২)
শব্দগুলো যেন তাঁরই সময়ের আয়না। কুরআন তাঁর হাতে কাঁপছিল। তাঁর হৃদয় থেমে গিয়েছিল। তিনি বুঝলেন—এই কিতাব মানুষের ভেতরের ক্ষুধাকে চিনে। এই কণ্ঠ কোনো মানুষের নয়—এ আল্লাহর কণ্ঠ।
সেই মুহূর্তেই লিওপোল্ড ওয়াইস আর থাকলেন না। জন্ম নিলেন মুহাম্মদ আসাদ। ইসলাম তাঁর কাছে কোনো নতুন ঈশ্বর আনেনি—বরং ফিরিয়ে দিয়েছে ইব্রাহিমের সেই একত্ববাদী ঈশ্বরকে, যাঁকে মানুষ পথ হারিয়ে ফেলেছিল।
ইসলাম তাঁকে অন্ধ বিশ্বাস শেখায়নি, শিখিয়েছে ভাবতে। শিখিয়েছে—যুক্তি ও ঈমান একে অপরের বিরোধী নয়, বরং একে অপরের পূর্ণতা।
এরপর তাঁর কলম হয়ে উঠল সংগ্ৰামী । তিনি বললেন—মুসলমানদের পতন ইসলামের কারণে নয়, চিন্তা বন্ধ করে দেওয়ার কারণে। তিনি ডাক দিলেন ইজতিহাদের, প্রশ্নের, জীবন্ত কুরআনের দিকে ফিরে যাওয়ার।
ইসলাম গ্রহণের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন—খ্রিস্টধর্মে তাঁকে অন্ধ বিশ্বাসের আহ্বান জানানো হয়েছিল, আর ইসলাম তাঁকে যুক্তি ব্যবহার করতে শিখিয়েছে। তাওহীদের স্বচ্ছতা, ঈমান ও বুদ্ধির সামঞ্জস্যই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। তাঁর কাছে ইসলাম ছিল ইহুদি নবী-ঐতিহ্যেরই পরিপূর্ণ রূপ, কিন্তু জাতিগত সীমানার ঊর্ধ্বে এক সার্বজনীন বার্তা।
পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণে ভূমিকা রাখেন, মুহাম্মদ ইকবালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হন এবং পাকিস্তানের প্রথম জাতিসংঘ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Road to Mecca ও The Message of the Qur’an আজও ইসলামী চিন্তাজগতে গভীর প্রভাব রেখে চলেছে।
মুহাম্মদ আসাদের জীবন প্রমাণ করে—ইসলাম কারো অতীত মুছে দেয় না, বরং তাকে পূর্ণতা দেয়। তিনি ইহুদি ঘরে জন্ম নিয়ে ইসলামে এসে মানবতার ঘর খুঁজে পেয়েছিলেন।
.jpg)
Comments
Post a Comment