এই তো আমরা

 



আমরা সবাই একটা নীরব বুদবুদের মধ্যে আটকে আছি, যার দেয়ালের বাইরে দেখা অসম্ভব। এই বুদবুদ স্বচ্ছ নয়, এটা আলোর সীমা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ, এবং এখানেই মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন ও বিপজ্জনক প্রশ্নের জন্ম হয়: মহাবিশ্বের বাইরে কী আছে?


আমরা যে মহাবিশ্ব দেখি, সেটা আসলে মহাবিশ্বের সেই অংশ যেখান থেকে আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। এই আলো আমাদের চোখে এবং টেলিস্কোপে পৌঁছাতে কোটি কোটি বছরের যাত্রা করেছে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে দূরের তারাগুলো, যেগুলোকে আমরা আজ ঝিকমিক করতে দেখি, সেগুলো আসলে ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে সৃষ্টি হয়েছে। আমরা সেগুলোকে “এখন” দেখছি না, বরং তাদের অতীত দেখছি।


এর পরে অন্ধকার। সম্পূর্ণ নীরব এবং শব্দহীন অন্ধকার। কিন্তু মনে রাখবেন, অন্ধকারের অর্থ শূন্যতা নয়। এই মহাবিশ্ব একটা বেলুনের মতো ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তে সব দিকে সমানভাবে প্রসারিত হচ্ছে, এবং এই প্রসারণ এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে: আমাদের মহাবিশ্বের বাইরে কি অন্য মহাবিশ্ব আছে? যদি কখনো আমরা এমন আলো শনাক্ত করি যা পৃথিবীতে পৌঁছাতে পনেরো বিলিয়ন বছর বা তার বেশি সময় নিয়েছে, তাহলে সেটা প্রমাণ হবে যে সেই আলো আমাদের মহাবিশ্ব থেকে নয়, বরং অন্য কোনো “দুনিয়া” থেকে এসেছে।


কিন্তু এখনো পর্যন্ত এমন কোনো আলো পাওয়া যায়নি। কিছু বিজ্ঞানী বলেন যে আমাদের মহাবিশ্ব একা হতে পারে না। সেখানে অসংখ্য মহাবিশ্ব থাকতে পারে, এবং এটাও সম্ভব যে সেখানে কিছুই নেই। শুধু এই একটা মহাবিশ্ব। আকর্ষণীয় বিষয় হলো, বিজ্ঞানীদের অনুমান অনুসারে এই সম্ভাবনাগুলো প্রায় পঞ্চাশ-পঞ্চাশ শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু যদি আমরা ধরে নিই যে সত্যিই অনেক মহাবিশ্ব আছে, তাহলে আরেকটা প্রশ্ন উঠে আসে যা প্রথম প্রশ্নের চেয়েও ভয়ংকর: এই সব মহাবিশ্ব কোন জিনিসের ভেতরে আছে? এবং সেই “জিনিসের” বাইরে কী আছে?


এখান থেকেই বিগ ব্যাং থিওরি কাঁপতে শুরু করে। বিগ ব্যাং আমাদের বলে যে পদার্থ, শক্তি এবং সময় – এসব কিছু সেই একটা মুহূর্তে অস্তিত্বে এসেছে। কিন্তু যদি মহাবিশ্বের বাইরে কিছু প্রমাণিত হয়, তাহলে তার অর্থ হবে যে সময়, পদার্থ বা শক্তি বিগ ব্যাংয়ের আগেও ছিল, এবং তাই বিগ ব্যাং থিওরিকে আবার নতুন করে লিখতে হবে। স্যার হিউ এভারেট বলেন যে কোয়ান্টাম মেকানিক্স আমাদের বলে একটা কণা একই সময়ে একাধিক জায়গায় থাকতে পারে, তাহলে প্রশ্ন হলো – যদি একটা কণা এটা করতে পারে, তাহলে পুরো মহাবিশ্ব কেন পারবে না? কারণ সেটাও তো সেই কণাগুলো দিয়ে গঠিত।


এভারেট বলেন যে এটা সম্ভব যে প্রতিটি সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত, প্রতিটি সম্ভাব্য ফলাফল একটা নতুন মহাবিশ্বের জন্ম দেয়। অর্থাৎ এই মুহূর্তেই কোথাও একটা মহাবিশ্ব থাকতে পারে যেখানে আপনি এটা পড়ছেন না, বরং অন্য কিছু করছেন।


এটা সমান্তরাল মহাবিশ্বের তত্ত্ব। এটা এখনো কোনো প্রমাণিত তত্ত্ব নয়, শুধু একটা ধারণা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এটা ছেড়ে দেননি, কারণ কখনো কখনো সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলো শুধু একটা চিন্তা থেকে শুরু হয়। এবং যদি কখনো প্রমাণিত হয় যে মহাবিশ্বের বাইরেও কিছু আছে, তাহলে তার প্রভাব শুধু বিজ্ঞানে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটা দর্শন এবং নাস্তিকতাকে নাড়িয়ে দেবে। কিন্তু কীভাবে?


স্টিফেন হকিংয়ের অবস্থান ছিল যে যেহেতু সময় বিগ ব্যাংয়ের পরে অস্তিত্বে এসেছে, তাই বিগ ব্যাংয়ের আগে কোনো স্রষ্টার ধারণা অর্থহীন। কিন্তু এখানে একটা পয়েন্ট আছে যা প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়: যদি মহাবিশ্বের বাইরে কিছু প্রমাণিত হয়, তাহলে বিগ ব্যাংয়ের “শেষ বিন্দু”তে দাঁড়ানো সেই নাস্তিক্যবাদী চিন্তাধারার ওপর আবার চিন্তা করতে হবে। এখন বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন, এখনো কোনো চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যায়নি। কিন্তু প্রশ্নটা তার পূর্ণ তীব্রতায় বিদ্যমান। আমি কোনো বিজ্ঞানী নই, কিন্তু আমার মনে হয় মহাবিশ্বের বাইরে অনেক কিছু আছে, কিন্তু আমাদের বিজ্ঞান সেখানে অসহায় কারণ সেটা আলোর অপেক্ষায় আছে এবং সেই ফোটনগুলো এখনো পৌঁছায়নি, বরং পথে আছে...!!!


اردو سے ترجمہ Rekaul Sk 

تحریر - تحسین الله خان

Comments

Popular posts from this blog

মহাকাশে এক বিশাল সমুদ্র

আমি কেন আল্লাহকে মানি ?

মেরাজের যাত্রা টেলিস্কোপ এবং ধারণার বাইরে