দুই সমুদ্রের জল না মিলিত হওয়ার রহস্য
কুরআন মাজীদ আমাদের জন্য সর্বপ্রথম ও সর্বোচ্চভাবে হিদায়াতের কিতাব। এটি কোনো বিজ্ঞানের পাঠ্যবই নয়; বরং মানুষের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালনার জন্যই নাযিল হয়েছে। তবুও কুরআনের কিছু আয়াতে এমন গভীর বাস্তবতার ইঙ্গিত রয়েছে, যা আধুনিক বিজ্ঞান আজ গবেষণা ও পরীক্ষার মাধ্যমে আবিষ্কার করছে। এর অর্থ এই নয় যে কুরআন বিজ্ঞান শেখাতে এসেছে, বরং এর ভাষা ও বর্ণনা এতটাই নিখুঁত ও সার্বজনীন যে, ১৪০০ বছর আগে বলা কথাগুলো আজকে আমাদের জন্য স্পষ্ট নিদর্শন যাতে ঈমান আরো বৃদ্ধি হয়।
এর একটি অসাধারণ উদাহরণ হলো আল্লাহ তায়ালার এই বাণী:
وَهُوَ الَّذِي مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ هَٰذَا عَذْبٌ فُرَاتٌ وَهَٰذَا مِلْحٌ أُجَاجٌ وَجَعَلَ بَيْنَهُمَا بَرْزَخًا وَحِجْرًا مَّحْجُورًا
তিনিই সেই সত্তা যিনি দুই সমুদ্রকে মিলিতভাবে প্রবাহিত করেছেন; একটি মিষ্টি, সুপেয় এবং অপরটি লবণাক্ত, খর; উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।
(সূরা আল-ফুরকান: ৫৩)
সাধারণভাবে আমরা প্রায়ই এমন ছবি দেখি, যেখানে বলা হয়—“দেখো, দু’টি সমুদ্র পাশাপাশি প্রবাহিত হচ্ছে, কিন্তু একে অপরের সঙ্গে মিশছে না—এটাই কুরআনের মু‘জিযা।” কথাটি আংশিক সত্য হলেও, বাস্তবতা এর চেয়েও অনেক গভীর।
আসলে এই আয়াতে ইঙ্গিত রয়েছে পদার্থবিদ্যার একটি মৌলিক নীতির দিকে—ঘনত্বের পার্থক্য (Density Difference)। মিষ্টি পানি সাধারণত হালকা, আর লোনা পানি ভারী। পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও চাপের পার্থক্যের কারণে এই দুই ধরনের পানির মাঝে একটি অদৃশ্য সীমারেখা সৃষ্টি হয়। কুরআনের ভাষায় এটিই “বারযাখ”—একটি অন্তরায় বা প্রাচীর। আধুনিক সমুদ্রবিজ্ঞানে একে বলা হয় হ্যালোক্লাইন (Halocline) বা পিকনোক্লাইন (Pycnocline)। এই স্তরটির কারণে দুই ধরনের পানি পাশাপাশি প্রবাহিত হলেও সহজে একে অপরের সঙ্গে মিশে যায় না।
এই নিয়মটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ—তা একটু গভীরভাবে ভাবলেই বোঝা যায়। যদি এই প্রাকৃতিক অন্তরায় না থাকত, তবে পৃথিবীর সব মিষ্টি ও লোনা পানি একত্রে মিশে যেত। এর ফলাফল হতো ভয়াবহ
নদী ও হ্রদের মিষ্টি পানিতে বসবাসকারী মাছ ও জীব টিকে থাকতে পারত না।
সমুদ্রের লোনা পানির জীবজগতও ধ্বংস হয়ে যেত।
সমুদ্রস্রোত (Ocean Currents) সঠিকভাবে কাজ করত না, যা পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে জীবনের ভারসাম্য ভেঙে পড়ত এবং জীবন টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠত।
অর্থাৎ, আমরা যে পৃথিবীতে আজ শান্তিতে বসবাস করছি, তার পেছনে এই “সাধারণ” মনে হওয়া প্রাকৃতিক নিয়মের এক বিরাট ভূমিকা রয়েছে—যা কুরআন মাত্র একটি আয়াতেই সংক্ষেপে ও নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে।
১৪০০ বছর আগে, যখন মানবসভ্যতা সমুদ্রবিজ্ঞানের এসব জটিল বাস্তবতা সম্পর্কে কিছুই জানত না, তখন এমন সুস্পষ্ট ও অর্থবহ বর্ণনা নিঃসন্দেহে গভীর চিন্তার দাবি রাখে। এটি শুধু বিস্ময় জাগায় না, বরং স্রষ্টার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও মহত্ত্ব সম্পর্কে আমাদের উপলব্ধিকে আরও গভীর করে তোলে।
সুতরাং তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে?

Comments
Post a Comment