মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির ডিএনএ
মানুষ ও শিম্পাঞ্জির ডিএনএ নিয়ে যখন বলা হয় যে “৯৮–৯৯% মিল”, তখন বেশিরভাগ মানুষ ধরে নেয়—প্রায় একই প্রাণী, শুধু একটু উন্নত সংস্করণ। কিন্তু বাস্তবতা এতটা সরল নয়। এই শতাংশটি পাওয়া হয় খুব নির্দিষ্টভাবে কিছু জিন বেছে নিয়ে, তাও শুধু প্রোটিন তৈরির অংশ (coding DNA) তুলনা করে। অথচ মানুষের পুরো ডিএনএর মাত্র ১–২% এই অংশ। বাকি বিশাল অংশ—যেখানে জিন নিয়ন্ত্রণ, timing, activation–deactivation, chromosome বিন্যাস—এসবই আসল পার্থক্য তৈরি করে, সেগুলো এই হিসাবের বাইরে থাকে।
যখন পুরো genome একসাথে তুলনা করা হয়, তখন দেখা যায় মানুষ ও শিম্পাঞ্জির মধ্যে কোটি কোটি base pair-এর পার্থক্য আছে। শুধু অক্ষরের অদলবদল নয়, অনেক জায়গায় বড় অংশ ঢোকানো হয়েছে, অনেক জায়গা বাদ গেছে। হাজার হাজার gene duplication ও rearrangement আছে। এই সব মিলিয়ে কার্যকরী পার্থক্য ১০–১৫ শতাংশ বা তারও বেশি হয়, যা জীববিজ্ঞানে খুবই বড় পার্থক্য।
Chromosome-এর ক্ষেত্রেও বড় ফারাক আছে। মানুষে ৪৬টি chromosome, শিম্পাঞ্জিতে ৪৮টি। এ নিয়ে বলা হয় মানুষের chromosome 2 নাকি শিম্পাঞ্জির দুটি chromosome জোড়া লেগে তৈরি। কিছু মিল খোঁজা যায় ঠিকই, কিন্তু সেই “fusion”-এর চিহ্ন সম্পূর্ণ নয়। মাঝখানের telomere ভাঙা, দ্বিতীয় centromere কাজ করে না। আর সবচেয়ে বড় কথা—এমন fusion সাধারণত প্রাণঘাতী হয়। যদি সত্যিই এমন ঘটনা ঘটত, তাহলে অসংখ্য intermediate population থাকার কথা ছিল, কিন্তু fossil বা genetic record-এ তার কোনো প্রমাণ নেই। তাই এটি নিশ্চিত প্রমাণ নয়, বরং একটি ব্যাখ্যা বা অনুমান।
ডিএনএ মিল মানেই পূর্বপুরুষ এক—এই ধারণাটাও বৈজ্ঞানিকভাবে বাধ্যতামূলক নয়। মানুষের সাথে কলার ডিএনএ-ও অনেকাংশে মিলে, ইঁদুরের সাথেও মিলে। কারণ জীবজগতে কোষের মৌলিক যন্ত্রপাতি অনেকটাই একরকম। একই ধরনের enzyme, repair system, metabolic pathway ব্যবহার করা হয়। এতে বোঝা যায় common design বা common biological toolkit থাকতে পারে, কিন্তু সেখান থেকে সরাসরি বলা যায় না যে এক প্রজাতি আরেক প্রজাতি থেকে এসেছে।
মানুষ ও শিম্পাঞ্জির প্রকৃত পার্থক্য লুকিয়ে আছে regulatory genes-এ—যে জিনগুলো অন্য জিনকে কখন, কোথায়, কতটা কাজ করবে তা নিয়ন্ত্রণ করে। অল্প কয়েকটি control switch বদলালেই মস্তিষ্কের গঠন, নিউরনের সংযোগ, শেখার ক্ষমতা আমূল বদলে যায়। মানুষের ক্ষেত্রে ভাষা, বিমূর্ত চিন্তা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, নৈতিক বোধ—এসবের সাথে জড়িত জিনগুলো দ্রুত ও আলাদা পথে পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো কীভাবে ধাপে ধাপে ঘটল, তার পরিষ্কার fossil বা experimental প্রমাণ নেই।
সবচেয়ে বড় ফাঁকটা হলো চেতনা ও আত্মপরিচয়ের জায়গায়। শিম্পাঞ্জি বুদ্ধিমান, অনুভূতিশীল, কিছুটা শেখে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মানুষ শিল্প সৃষ্টি করে, ধর্ম নিয়ে ভাবে, ন্যায়–অন্যায় বিচার করে, গণিত ও দর্শন তৈরি করে, “আমি কে” এই প্রশ্ন তোলে। এই লাফটা শুধু হাড় বা দাঁতের নয়, এটি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক। এই লাফকে এখনো কোনো জিন মিউটেশন বা fossil ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা করতে পারেনি।
এই কারণেই অনেক খ্যাতনামা বিজ্ঞানী বলেন—ডিএনএ কেবল রাসায়নিক নয়, এটি তথ্য। আর তথ্য সবসময় কোনো উৎস থেকে আসে। ডিএনএ মিল থাকা মানেই বিবর্তন চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত—এটা বলা অতিরঞ্জন। বরং এটা দেখায় যে জীবজগতে একটি গভীর সম্পর্ক ও নকশা আছে, যার ব্যাখ্যা এখনো অসম্পূর্ণ।
সংক্ষেপে বললে, মানুষ ও শিম্পাঞ্জির মধ্যে কিছু জিনগত মিল আছে—এটা সত্য। কিন্তু মানুষ শিম্পাঞ্জির উন্নত সংস্করণ—এটা প্রমাণিত সত্য নয়। ডিএনএ মিল মানেই পূর্বপুরুষ এক—এই সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে বাধ্যতামূলক নয়। মানুষের ভাষা, চেতনা, নৈতিকতা ও আত্মবোধ—এসব এখনো বিবর্তন তত্ত্বের সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে আছে।
.png)
Comments
Post a Comment