চোখের ধোঁকা এবং বুদ্ধির উড়ান: ‘গায়েব’ কি শুধু ধর্মের বিষয় নাকি বিজ্ঞানের বাধ্যবাধকতা? - বিলাল শওকত আজাদ
যে জিনিস চোখে দেখা যায় না, তার অস্তিত্ব কি নেই?
এটি সেই প্রাচীন এবং মৌলিক প্রশ্ন যা মানব ইতিহাসে "ম্যাটেরিয়ালিস্টদের" এবং "ধার্মিকদের" মধ্যে একটি লাইন টেনে রেখেছে।
আমাদের যুগের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক ট্র্যাজেডি এই যে, আমরা "গায়েব" (The Unseen) শব্দটিকে শুধু মসজিদেবং গির্জার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি।
সাধারণ মনে এই ধারণা গেঁথে গেছে যে "বিজ্ঞান" হলো সেই জিনিসের নাম যা সামনে টেবিলে রাখা আছে, যাকে ছোঁয়া যায়, ওজন করা যায় এবং দেখা যায়, আর "ধর্ম" হলো কল্পিত কথা, পরীদের গল্প এবং অতীন্দ্রিয় ধারণার নাম যার বাস্তবতার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু যখন আমরা এই বর্ণনার উপরের স্তরটি খোসা ছাড়িয়ে বাস্তবতার গভীরে প্রবেশ করি, তখন আমাদের একটি চমকপ্রদ উদঘাটন হয়।
সেই উদঘাটন এই যে, যাকে আমরা "বৈজ্ঞানিক জ্ঞান" বলি, তার নিজের অস্তিত্বও "গায়েব"-এর স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
গায়েব শুধু ধার্মিক শব্দ মাত্র নয়, বরং তার বিস্তৃত এবং সাধারণ অর্থে গায়েব হলো প্রত্যেক সেই "জ্ঞাত"-এর নাম যা আমাদের পাঁচ ইন্দ্রিয়ের (Senses) গ্রাসে আসে না, কিন্তু তার অস্তিত্ব একটি "বাস্তবতা"।
আসুন প্রথমে বিজ্ঞানের প্রেক্ষাপট থেকে এই মামলার পর্যালোচনা করি।
আমরা শৈশব থেকে পড়ে আসছি যে বিজ্ঞান হলো পর্যবেক্ষণের (Observation) নাম।
নিশ্চয়ই তাই।
কিন্তু প্রশ্ন এই যে, পর্যবেক্ষণ কার হয়?
বিজ্ঞানী সর্বদা "প্রভাবসমূহ" (Effects)-এর পর্যবেক্ষণ করে, এবং সেই প্রভাবসমূহের ভিত্তিতে যে "কারণ" (Cause) বা "তত্ত্ব" (Theory)-এর দিকে পৌঁছায়, তা প্রায়শই চোখের আড়ালে থাকে।
উদাহরণস্বরূপ, নিউটন একটি আপেল পড়তে দেখেছিলেন (এটি ছিল ইন্দ্রিয়গত জ্ঞান বা "শহাদত"), কিন্তু তার পড়ার কারণ যে শক্তিকে নির্ধারণ করেছিলেন, অর্থাৎ "মাধ্যাকর্ষণ" (Gravity), তা নিউটন দেখেননি, আইনস্টাইন দেখেননি, এবং আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ দেখেনি।
মাধ্যাকর্ষণের কি কোনো রং আছে?
কোনো গন্ধ আছে?
কোনো শরীর আছে?
না।
মাধ্যাকর্ষণ নিজে একটি "গায়েব"।
আমরা শুধু তার "প্রভাবসমূহ" দেখেছি যে জিনিসগুলো নিচে পড়ে এবং গ্রহগুলো কক্ষপথে ঘুরে।
এই প্রভাবসমূহের ব্যাখ্যা (Explanation)-এর জন্য বুদ্ধি যে "তত্ত্ব" প্রণয়ন করেছে, তা গায়েবের উপর ঈমান আনারই একটি বৈজ্ঞানিক রূপ।
একইভাবে অ্যাটমকে নিন।
আধুনিক কোয়ান্টাম ফিজিক্স আমাদের বলে যে ইলেকট্রন (Electron) কোনো কঠিন বল নয় যাকে মাইক্রোস্কোপের নিচে রেখে দেখা যায়।
এটি সম্ভাবনার একটি মেঘ (Cloud of Probability)।
কোনো বিজ্ঞানী আজ পর্যন্ত ইলেকট্রনকে নিজের চোখে দেখেননি, তারা শুধু ক্লাউড চেম্বারে তার চলার চিহ্নসমূহ (Traces) দেখেছেন।
এই চিহ্নসমূহ দেখে এই "অনুমান" (Inference) স্থাপন করা যে "এখানে ইলেকট্রন উপস্থিত আছে", ঠিক সেই কাজ যাকে ধর্মের ভাষায় "ঈমান বিলগায়েব" বলা হয়।
একজন বিজ্ঞানী যখন ল্যাবরেটরিতে তত্ত্বসমূহ (Theories) প্রণয়ন করে, তখন সে আসলে "অদৃশ্য" (Unseen)-এর খসড়া নিজের মনে তৈরি করছে।
বিগ ব্যাং থিওরি হোক, ডার্ক ম্যাটারের ধারণা হোক, বা ব্ল্যাক হোলের ভিতরের জগত, এসবই বিজ্ঞানীর ইন্দ্রিয়ের বাইরে, কিন্তু সে নিজের "অনুমান"-এর ভিত্তিতে তাদের অস্তিত্বে বিশ্বাস রাখে।
অতএব, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের একটি খুব বড় অংশ ইন্দ্রিয়গত নয়, বরং "অনুমানভিত্তিক" (Inferential), এবং দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রত্যেক অনুমানভিত্তিক জ্ঞান "গায়েব"-এরই শ্রেণীতে পড়ে।
এখন আমরা ঐশ্বরিকতার (অধ্যাত্মবাদের) প্রেক্ষাপটের দিকে আসি।
ধর্মের উপর সবচেয়ে বড় আপত্তি এই করা হয় যে
"তোমরা ঈশ্বর, ফেরেশতা এবং আখেরাতকে মানো যদিও তোমরা তাদের দেখোনি, এ তো অন্ধ বিশ্বাস (Blind Faith)।"
এখানে আমাদের কুরআনের মামলা বুঝতে হবে।
কুরআন যখন সূরা আল-বাকারার শুরুতে মুমিনের সংজ্ঞা দেয় যে
"الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ"
(যারা গায়েবের উপর ঈমান আনে),
তখন তার অর্থ এটা কখনোই নয় যে তারা "বিনা যুক্তিতে" ঈমান আনে।
ইসলামে "ঈমান"-এর অর্থ চোখ বন্ধ করে নেওয়া নয়, বরং চোখ খুলে মহাবিশ্বের চিহ্নসমূহ দেখা এবং তা থেকে স্রষ্টার দিকে পৌঁছানো।
এই জন্য কুরআনে অনেক জায়গায় تتفکرون শব্দ এসেছে অর্থাৎ সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করে সৃষ্টির আসল সৃষ্টিকর্তাকে চেনা।
যেমন একজন বিজ্ঞানী ধোঁয়া দেখে (যা ইন্দ্রিয়গত) আগুনের বিশ্বাস করে (যা তখন দেখা যাচ্ছে না), ঠিক তেমনি একজন মুমিন মহাবিশ্বের শৃঙ্খলা, জীবনের জটিলতা এবং মানুষের চেতনা দেখে (যা ইন্দ্রিয়গত) সেই স্রষ্টার বিশ্বাস করে যিনি চোখের আড়ালে।
ধার্মিকদের এই দাবি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ যে যে গায়েবি সত্যসমূহের আমরা সত্যায়ন করি, তার জন্য আমাদের কাছে "ইন্দ্রিয়গত প্রমাণ" নেই বরং "যুক্তিগত প্রমাণ" (Rational Evidence) আছে।
মহাবিশ্বের নিজে থেকে না তৈরি হতে পারা, জীবনের উদ্দেশ্যহীন না হওয়া, এবং ওহীর মানুষী কথার চেয়ে উচ্চতর হওয়া, এগুলো সেই "যুক্তিসমূহ" যা আমাদের সেই "গায়েব"-এর দিকে নিয়ে যায়।
অতএব, ঈমান বিলগায়েব হলো "ইন্দ্রিয়ের" বাইরের বাস্তবতাকে মানার নাম, নয় যে "যুক্তির" বাইরের বাস্তবতাকে মানার।
যদি বিনা যুক্তিতে মানা ঈমান হতো, তাহলে কুরআন বারবার এটা না বলত যে
"কি তোমাদের বুদ্ধি নেই?", "কি তোমরা চিন্তা করো না?"।
চিন্তা-ভাবনার আহ্বানই এর প্রমাণ যে এটা অনুমানের পথ।
এই সম্পূর্ণ দৃশ্যপটে বিজ্ঞান এবং ধর্মের মিলন (Harmony) এই যে, উভয়ই "বাস্তবতায় পৌঁছানোর" জন্য একই পদ্ধতি ব্যবহার করে, এবং তা হলো "চিহ্নসমূহ থেকে বাস্তবতার যাত্রা"।
বিজ্ঞানী পায়ের চিহ্ন দেখে সৃষ্টির দিকে পৌঁছায়, এবং মুমিন মহাবিশ্বের চিহ্ন দেখে স্রষ্টা অর্থাৎ ঈশ্বরের দিকে পৌঁছায়।
পার্থক্য শুধু এই যে, বিজ্ঞানী যে গায়েবে (যেমন মাধ্যাকর্ষণ বা ডার্ক এনার্জি) পৌঁছায় তা "ভৌতিক" (Physical), এবং মুমিন যে গায়েবে (ঈশ্বর এবং আখেরাত) পৌঁছায় তা "অতীন্দ্রিয়" (Metaphysical)।
কিন্তু "পদ্ধতি" একই।
যদি একজন নাস্তিক বিজ্ঞানী বলে যে
"আমি ঈশ্বরকে মানি না কারণ আমি তাকে দেখিনি",
তাহলে তাকে নিজের এই নীতির ভিত্তিতে "বুদ্ধি" (Mind)-কেও অস্বীকার করতে হবে, কারণ সে আজ পর্যন্ত নিজের মস্তিষ্ক তো অস্ত্রোপচারে দেখেছে হয়তো কিন্তু নিজের "বুদ্ধি" বা "চেতনা"কে কখনো দেখেনি।
তাকে "ভালোবাসা", "যন্ত্রণা" এবং "স্বপ্ন"-কেও অস্বীকার করতে হবে কারণ এগুলো মাইক্রোস্কোপের নিচে দেখা যায় না।
বাস্তবতা এই যে মানুষ একটি দ্বৈত অস্তিত্ব।
তার শরীর "আলমে শহাদত" (দেখা যায় এমন জগতে) থাকে, কিন্তু তার আত্মা এবং বুদ্ধি "আলমে গায়েব"-এ শ্বাস নেয়।
আমরা যতটা জ্ঞান নিজের ইন্দ্রিয়সমূহ (চোখ, কান, নাক) থেকে লাভ করি, তার চেয়ে অনেক বেশি জ্ঞান আমরা নিজের "অন্তর্দৃষ্টি" এবং "অনুমান" থেকে লাভ করি।
এটা বলা যে "শুধু দেখা যায় এমন জিনিসই সত্য", মানুষী চেতনার অপমান।
দেখা তো মরীচিকাও (Mirage) আসে কিন্তু তা মিথ্যা হয়, এবং দেখা তো বায়ু আসে না কিন্তু তা জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য।
সারকথা এই যে
"গায়েব" অজ্ঞতার নাম নয়, বরং এটি জ্ঞানের সেই সর্বোচ্চ স্তর যেখানে মানুষের চোখ কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং তার "দূরদর্শিতা" (Insight) কাজ শুরু করে।
তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা (Theoretical Physics) হোক বা ইসলামী ঐশ্বরিকতা (Islamic Theology), উভয়ই এ ব্যাপারে একমত যে আসল বাস্তবতা সেই নয় যা "পৃষ্ঠে" ভাসছে, বরং আসল বাস্তবতা সেই যা "গভীরে" লুকিয়ে আছে।
মুমিন সে নয় যে অন্ধকারে তীর চালায়, বরং মুমিন সে জ্ঞানী যে মহাবিশ্বের চিহ্নসমূহকে যুক্ত করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় যে এই শিল্পকর্মের পিছনে একজন স্রষ্টার থাকা ততটা জরুরি যতটা লেখার পিছনে লেখকের থাকা।
অতএব, গায়েবের উপর ঈমান আনা আসলে বুদ্ধির ব্যবহারের সর্বোচ্চ শিখর।
#গুরুত্বপূর্ণ_কথা
اردو سے ترجمہ - رکؤل شیخ
تحریر - بلال شوکت آزاد

Comments
Post a Comment