" ফিরাউনের জাদুকরের মাথা নত থেকে আজকের এক আগন্তুকের এই দাবী ' আমি শয়তানদের নবী আমার বয়স ৪৫৬, আমি এসেছি সমাজ পরিবর্তন করতে" কারীর মাথা নত পর্যন্ত " ।
সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন ও কোলাহলপূর্ণ জগতে কিছু মানুষ থাকে, যারা কেবল চেহারা বা বক্তব্যের জন্য নয়—নিজেদের জীবনের বাঁকবদলের জন্য ইতিহা،স হয়ে যায়। তেমনই একজন নাম—এফে বায়জান, যিনি দীর্ঘদিন “জেবানি এফে” নামে পরিচিত ছিলেন।
একসময় নিজেকে তিনি পরিচয় দিতেন রহস্যময় ও ভীতিকর এক পরিচয়ে—
“৪৫৬ বছর বয়সী জেবানি”, “জাহান্নামের রক্ষক”, এমনকি “সাতানিস্টদের নবী” বলেও।
তার পিঙ্ক চুল, ট্যাটু, পিয়ার্সিং আর কঠোর বক্তব্য—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন বিতর্ক, কৌতূহল আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
কিন্তু সময় থেমে থাকে না।
আর মানুষের অন্তর—সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনের স্থান।
এক সাক্ষাৎকারে সে বলে
“২০২৪ সালের ৬ জুন, তুরস্কের ১৫% মানুষ শয়তানবাদী হয়ে যাবে। ৩ বছর আগে আমার একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম এটা নিয়ে। সহকারী মাস্টার এটা আমাকে নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।” ।
“আমি একটা মানুষের শরীরে আছি, আসলে আমি এখন মানুষ নই। আমার দুটো জিন আছে।”
“০৬/০৬/২০২৪ তারিখে, তুরস্কের ১৫% শয়তানবাদী হবে। বিদ্রোহ হবে, আমি এবং আমার লিজিয়নদের দ্বারা আবার যুদ্ধ শুরু হবে।”
“আমি আমার দায়িত্ব পালন করব, আমি মরে যাব। আমি আসল জীবন শুরু করব। এজন্যই আমাকে এই দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে। মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে।”
“মানুষ কি আপনাকে ভয় পায়?” জিজ্ঞাসা করেছিলেন হোস্ট।
“হ্যাঁ, ভয় পায়। সাধারণত মহিলা, শিশু, বৃদ্ধরা ভয় পায়।”
“আমার অনুভূতিগুলো খুব শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ, আমি এখন আপনি কী ভাবছেন তা জানতে পারি।”
ইসলাম নিয়ে তার প্রশ্নগুলো
যখনই তার সুযোগ হতো কোনো মুসলিমের সাথে বিতর্ক করার, তিনি সবসময় ভালোভাবে প্রস্তুত প্রশ্ন এবং সেগুলোর সমর্থনে প্রমাণ নিয়ে আসতেন, তার শেষ পডকাস্ট উপস্থিতি পর্যন্ত। এফে জেবানি প্রথমবার তুর্কি পডকাস্ট “আন্ডারগ্রাউন্ড”-এ উপস্থিত হয়েছিলেন প্রায় তিন মাস আগে, যেখানে তিনি আগে উল্লেখিত দাবিগুলো করেছিলেন। তিন মাস পরে, চ্যানেলের হোস্ট আবার এফে জেবানিকে আমন্ত্রণ জানান, এবার তার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য ইসলামী জ্ঞানে পারদর্শী একজন ব্যক্তিকে নিয়ে আসেন।
দ্বিতীয় পডকাস্ট
স্বাভাবিকভাবে, এফে জেবানি তার দাবি সমর্থনে উদ্ধৃত করার জন্য প্রশ্ন এবং ধর্মগ্রন্থের একটা অস্ত্রাগার নিয়ে এসেছিলেন। তিনি তার প্রশ্নের ঝড় শুরু করেন, যার মধ্যে ছিল ক্লিশে যেমন মহিলাদের প্রতি সহিংসতা, অমুসলিমদের প্রতি সহিংসতা, বিধিনিষেধ এবং দুনিয়ায় ভালোর পিছনে আল্লাহ থাকলে মন্দও ঘটে কেন। তিনি কি এ দুটোরই কারণ? এসব এবং আরও অনেক প্রশ্ন ছিল যার উত্তর তিনি খুঁজছিলেন। তার আচরণ এবং কথার ধরন থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, তিনি হয়তো অজ্ঞেয়বাদী মনে হলেও, উত্তর পেলে তিনি জমা দিতে প্রস্তুত। তিনি ইন্টারভিউয়ের মাঝে একাধিকবার বলেছেন “আমাকে বোঝান, হয়তো আমি বিশ্বাস করব”।
“যদি আমরা প্রমাণ করি যে ইসলাম সত্যিকারের ধর্ম, তাহলে এবার কি আপনি বলবেন যে আমি এতদিন বৃথা জীবন যাপন করেছি?” জিজ্ঞাসা করেছিলেন হোস্ট।
“আপনারা আমাকে প্রমাণ করতে পারবেন না” উত্তর দিয়েছিলেন এফে জেবানি।
“কেন আমরা প্রমাণ করতে পারব না?” জিজ্ঞাসা করেছিলেন হোস্ট।
“প্রমাণ করুন তাহলে কথা বলি” উত্তর দিয়েছিলেন এফে।
শেষমেশ সে তার প্রশ্ন গুলোর সন্তুষ্টিকর উত্তর পেয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। এবং উমরা আদায় করে।
প্রশ্ন গুলো
১. ইসলামে মহিলাদের প্রতি সহিংসতা আছে কেন? (যেমন: স্ত্রী প্রহারের অনুমতি ইত্যাদি)
- কুরআনের নিসা সূরার ৩৪ নম্বর আয়াতে ("পুরুষরা নারীদের উপর কর্তৃত্বকারী...") উল্লেখিত "প্রহার" (daraba) শব্দটি অনেক আধুনিক এবং ঐতিহ্যবাহী আলিম (যেমন: ইমাম গাজ্জালি, ইবনে কাসির) অনুসারে **হালকা এবং প্রতীকী** (যেমন: মিসওয়াক দিয়ে স্পর্শ করা)। এটা শেষ অপশন, এবং নবী (সা.) নিজে কখনো স্ত্রীদের প্রহার করেননি।
- নবী (সা.) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই, যে তার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম আচরণ করে। আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম।" (তিরমিজি)।
- ইসলাম নারীদের অধিকার দিয়েছে যা তৎকালীন সমাজে ছিল না: উত্তরাধিকার, সম্পত্তি, বিবাহে সম্মতি ইত্যাদি। সহিংসতা নয়, **সুরক্ষা এবং সম্মানই মূল নীতি।
২. অমুসলিমদের প্রতি সহিংসতা (জিহাদ, অমুসলিমদের হত্যা ইত্যাদি)
- ইসলামে জিহাদ প্রধানত **প্রতিরক্ষামূলক**। কুরআন বলে: "তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে তোমরাও যুদ্ধ করো, কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করো না।" (বাকারা ১৯০)।
- অমুসলিমদের সাথে শান্তি চুক্তি থাকলে তা পালন করতে হবে। নবী (সা.) বলেছেন: "যে কোনো অমুসলিমকে (জিম্মি) হত্যা করে, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।" (বুখারি)।
- কুরআনে বলা হয়েছে: "ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।" (বাকারা ২৫৬)। অমুসলিমরা মুসলিম সমাজে নিরাপদে বাস করতে পারে, জিজিয়া কর দিয়ে (যা যুদ্ধ থেকে মুক্তির বিনিময়ে)।
- ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম শাসনে ইহুদি-খ্রিস্টানরা সুরক্ষিত ছিল, যা ইউরোপীয় অত্যাচারের বিপরীতে।
৩. ইসলামে অনেক বিধিনিষেধ (restrictions) কেন? (যেমন: পোশাক, খাদ্য, বিনোদন)
- বিধিনিষেধগুলো **মানুষের কল্যাণের জন্য**। যেমন: অ্যালকোহল নিষিদ্ধ কারণ এতে সমাজে অপরাধ, দুর্ঘটনা বাড়ে (কুরআন ধাপে ধাপে নিষেধ করেছে)।
- হিজাব/পর্দা নারীদের সম্মান ও সুরক্ষার জন্য, পুরুষদের দৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের জন্যও নির্দেশ আছে।
- এগুলো স্বাধীনতা কেড়ে নেয় না, বরং আত্মিক স্বাধীনতা দেয় – দুনিয়ার লোভ থেকে মুক্তি। নবী (সা.) বলেছেন: "দুনিয়া মুমিনের জেলখানা।" কিন্তু এতে শান্তি ও নৈতিকতা আসে।
৪. দুনিয়ায় মন্দ (evil) ঘটে কেন? আল্লাহ কি মন্দেরও কারণ? (Theodicy বা শয়তানের প্রশ্ন)
- এটা সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন। ইসলামে উত্তর: আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং সবকিছু তার ইচ্ছায় ঘটে, কিন্তু মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা (free will) আছে। মন্দ মানুষের ভুল ব্যবহার থেকে আসে, না আল্লাহ থেকে।
- কুরআন: "যা কিছু ভালো তোমার হয় তা আল্লাহ থেকে, আর যা মন্দ তোমার হয় তা তোমার নিজের কাজ থেকে।" (নিসা ৭৯)।
- পরীক্ষা: দুনিয়া পরীক্ষাস্থল। "আমি তোমাদের মাল ও সন্তান দিয়ে পরীক্ষা করব..." (আনফাল ২৮)। মন্দের মধ্য দিয়ে ধৈর্য, ভালো কাজের সুযোগ আসে।
- শয়তানের ভূমিকা: শয়তান প্ররোচিত করে, কিন্তু জোর করে না। শেষ বিচারে সবাই ন্যায় পাবে – জান্নাত/জাহান্নাম।
- আলিমরা (যেমন: ইমাম গাজ্জালি তার "ইহিয়া উলুমিদ্দিন"-এ) বলেন: মন্দ ছাড়া ভালোর মূল্য বোঝা যায় না, এবং আল্লাহর হিকমত (প্রজ্ঞা) আমাদের বোধের ঊর্ধ্বে।
এই উত্তরগুলো এফে জেবানির মতো অনেককে সন্তুষ্ট করেছে, কারণ ইসলাম যুক্তি ও বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদি আরও নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নের বিস্তার চান, তাহলে জানান!
Rekaul Sk
.jpg)
Comments
Post a Comment